রবিবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১২

পাকিস্তানে সুপ্রিম কোর্ট ও ক্যান্টনমেন্ট সমানে সমান!


পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানিকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট ২৬ এপ্রিল ৩০ সেকেন্ডের যে প্রতীকী দণ্ড দিয়েছেন, তা পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম। বিশ্বের ইতিহাসেও বিরল। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশ পায়নি। তবে সংক্ষিপ্ত আদেশ পড়ে প্রতীয়মান হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের এ বেঞ্চ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ থেকে গিলানির প্রস্থান চাইছেন। কিন্তু এই আদেশ ত্রুটিপূর্ণ ও প্রশ্নসাপেক্ষ। 
আমার প্রাথমিক মন্তব্য হচ্ছে, নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী দল এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শীর্ষস্থানীয় আইনজীবী আদালতের রায়ে দণ্ডিত হওয়ামাত্রই গিলানি প্রধানমন্ত্রীর পদে অযোগ্য হয়ে পড়েছেন বলে যে মন্তব্য করছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। এর নৈতিক ভিত্তি যদিও বা আছে, সাংবিধানিক কোনো ভিত্তি নেই। তাঁকে অবৈধ বলা একটা বাগাড়ম্বর।
সুপ্রিম কোর্টে দণ্ডিত হওয়ার পর গিলানি যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করতেন, তাহলে তিনি নৈতিকতার দিক থেকে একটি অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতেন। সেই সুযোগ তাঁর ও পিপিপির সামনে খোলা থাকছে। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের সামনেও আপিলকালে তার রায়ের ত্রুটি শোধরানোর পথ খোলা।
‘ডার্টি মানি’র স্বর্গরাজ্য সুইসব্যাংক। আমাদের দেশি ভ্রাতঃগণও হয়তো পিছিয়ে নেই। ১/১১তে ক্লেম্যান আয়ল্যান্ডে মিলিয়ন ডলার লুকানোর গল্প শুনেছিলাম। সুইস তদন্তকারীরা বেনজির ভুট্টোর এক লাখ ১৭ হাজার পাউন্ডের হীরার অলংকারসহ ভার্জিন আয়ল্যান্ডে পাওয়া জারদারি দম্পতির ১২ মিলিয়ন ডলার জব্দ করেছিলেন। ২০০৩ সালে সুইসকোর্টে ৫০ হাজার ডলার জরিমানাসহ তাঁরা দণ্ডিত হয়েছিলেন। দণ্ডিত রাষ্ট্রপতির পর পাকিস্তান পেল দণ্ডিত প্রধানমন্ত্রী। জারদারি আপিল করেছিলেন। সেই মামলাই বিচারাধীন ছিল, সুপ্রিম কোর্ট যা পুনরুজ্জীবিত করতে সুইস কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিতে গিলানিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। 
জেনারেল পারভেজ মোশাররফ প্রধান বিচারপতি ইফতেখার আহমেদ চৌধুরীকে নজিরবিহীন উপায়ে বরখাস্ত করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি এর প্রতিবাদে বিক্ষুব্ধ আইনজীবী সমাজকে সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানজুড়ে এক অসাধারণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। এর ফলে অপসারিত প্রধান বিচারপতি আবার স্বপদে ফেরেন। কিন্তু পিপিপির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিশ্বের প্রায় সব দেশের সংবিধানে লেখা থাকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বিরুদ্ধে যেকোনো ধরনের ফৌজদারি কার্যধারা অচল। পাকিস্তানের সংবিধানের ২৪৮ অনুচ্ছেদেও তাই বলা। আমাদের সুপ্রিম কোর্টও এরশাদের একটি মামলায় তেমনই রায় দেন।
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট প্রধানমন্ত্রীকে ওই যে আদেশটি দিলেন, সেটি কী করে ২৪৮ অনুচ্ছেদের ওই বাধানিষেধ পেরিয়ে যৌক্তিক হতে পারল তার ব্যাখ্যা আমরা পাই না। এটাই আদালতের বিরোধপূর্ণ আদেশটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। 
বিচারপতি নাসির উল মুলকের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের বেঞ্চের সংক্ষিপ্ত আদেশটি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আক্রমণাত্মক বললে সম্ভবত অত্যুক্তি হবে না। আদালত অবমাননার এই সুয়োমোটো মামলাটি ১৯ জানুয়ারি থেকে ২১ দিন ধরে শুনানি চলেছে। একজন কর্মরত প্রধানমন্ত্রীকে দণ্ডাদেশ দেওয়ার সংক্ষিপ্ত আদেশে অবাক হয়ে দেখি, নির্বাহী বিভাগের পক্ষ থেকে যেসব জ্বলন্ত সাংবিধান প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, সে বিষয়ে আদালত একেবারেই নীরব। বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীকে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড দেওয়া হলো। এর কারণসমূহ পরে লিপিবদ্ধ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে আদালতের নির্দেশনা উপেক্ষা, অমান্য ও অবাধ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা সন্তুষ্ট হয়েছি যে তিনি যেভাবে আদালত অবমাননা করেছেন, তাতে বিচার প্রশাসনে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতি বয়ে এনেছে এবং দেশের বিচার বিভাগ উপহাসের পাত্রে পরিণত হয়েছে।’ উপহাস বা রিডুক্যুল শব্দটি সুচিন্তিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সংবিধানের একটি অভিনব বিধানের ফাঁদে ফেলে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সরানোর রাস্তা খুলে যায়। আদালতের সংক্ষিপ্ত আদেশ তাই যেভাবে প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের উপায় নির্দেশ করেছে তাতে তাদের প্রজ্ঞা ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন না তুলে উপায় থাকে না। 
সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ বলেন, ‘ওপরে উল্লিখিত “ফাইন্ডিংস” ও দণ্ডাদেশের ফলে সংবিধানের ৬৩(১)(ছ) অনুচ্ছেদের শর্তাবলিতে কতিপয় গুরুতর ফলাফল আনতে পারে, যা কি না তাঁর বিরুদ্ধে দণ্ডাদেশ প্রদানের উপশমক ফ্যাক্টর হিসেবে গণ্য হতে পারে। এমতাবস্থায় তাঁকে আজ আদালতের কার্য শেষ হওয়া পর্যন্ত আদালত কক্ষে অন্তরীণ থাকার শাস্তি দেওয়া হলো।’
পাকিস্তানের সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদটিতে সাংসদেরা কী কী কারণে অযোগ্য হতে পারেন তার ফিরিস্তি রয়েছে, যেমন আছে আমাদের সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে, যার আওতায় সম্প্রতি সোহেল তাজ ইস্তফা দিলেন। কিন্তু পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের ওই অনুচ্ছেদটি একটি অনাসৃষ্টি। ১৯৫৬ সালের ৪৫ অনুচ্ছেদ ও ১৯৬৮ সালের ১০৪ অনুচ্ছেদ আজকের পাকিস্তানের ৬৩ অনুচ্ছেদের পূর্বসূরি। এমপি পদ খাওয়ার এমন আজগুবি শর্তাবলি সেখানে দেখি না। এটা প্রথম দেখি বাংলাদেশকে হারানোর পর ১৯৭৩ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোর তৈরি করা নতুন সংবিধানে। সেই সংবিধানে ভুট্টো চালাকি করে পাকিস্তানের ক্ষমতার শাশ্বত সূতিকাগার সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। জ্যেষ্ঠদের ডিঙিয়ে জিয়াউল হককে তিনি সেনাপ্রধান করেন। জিয়াই তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলান। এই গল্পটা যতটা প্রচার পেয়েছে পিপিপির এই সাংবিধানিক দুষ্কর্ম, যার বিবরণ এখন আমি আপনাদের দেব, সেটা আজও ততটা প্রচার পায়নি। এমনকি আমি হতাশ হচ্ছি, এখনকার পাকিস্তানি নাগরিক সমাজও এ বিষয়ে নীরব। 
আর কী নির্মম পরিহাস, সেই পিপিপি এখন এত বছর পর সেই ৬৩ অনুচ্ছেদের ছ বিধানের ফান্দে পড়েছে। ‘আমি সাধু এবং সম্মানিত’, এ কথা বুকে-পিঠে লিখে যদি কেউ ঘুরে বেড়ান, তাহলে লোকে তাঁকে হয় পাগল, না হয় মতলববাজ হিসেবে সন্দেহ করবেই। ঠিক তেমন করে পিপিপি সম্ভবত ১৯৭৩ সালের সংবিধানেই প্রথম লিখল, ‘যদি কোনো সাংসদ পাকিস্তানের আদর্শের জন্য ক্ষতিকর কোনো মতামত প্রচার কিংবা কোনোভাবে তৎপরতা চালান কিংবা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তা বা নৈতিকতা বা জনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা পাকিস্তানের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বা তার সাধুতা বা বিচার বিভাগ ও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর মানহানি বা তাকে ঠাট্টা করেন এবং সে জন্য কোনো উপযুক্ত এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে দণ্ডিত হন এবং ছাড়া পাওয়ার পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয় তাহলে তিনি সাংসদ থাকবেন না।’ 
আমরা পাকিস্তানিদের মতো এবার সামরিক শাসন ঠেকাতে ৭ক অনুচ্ছেদ যুক্ত করেছি। ভুট্টো সামরিক শাসন জারিকে হাইট্রিজন এবং সে জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান করেছিলেন ওই ’৭৩ সালেই। জলপাই রঙের লোকেরা যাতে খেপে না যায় সে জন্য তিনি ওই নতুন বিধানটি যুক্ত করেন। সুপ্রিম কোর্ট ও ক্যান্টনমেন্টের মর্যাদা সমান করেন। এখন পাকিস্তানের বিরোধী দল লম্ফঝম্ফ দিচ্ছে এই বলে যে গিলানি ক্যান্টনমেন্টকে না হলেও সুপ্রিম কোর্টকে ‘উপহাস’ করেছেন। তাই আদালত থেকে বেরোনোর পর থেকেই তিনি আর পাকিস্তানের বৈধ প্রধানমন্ত্রী নন। 
পিপিপির বর্তমান সরকার বিরোধী দলকে আস্থায় রেখে এক ঐতিহাসিক সাংবিধানিক উন্নয়ন নিশ্চিত করেছে। এ থেকে শিক্ষা নিতে একটু বিশদভাবে বলি। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে। ৯০ অনুচ্ছেদ বলেছে, নির্বাহী কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির নামে কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা প্রয়োগ হবে। আর কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের দ্বারা গঠিত হবে। আর সেই কেন্দ্রীয় সরকার প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ৯১ অনুচ্ছেদ বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি মন্ত্রিসভা থাকবে আর সেটি রাষ্ট্রপতিকে তাঁর দায়িত্ব পালনে পরামর্শ দেবে। ৪৮ অনুচ্ছেদ বলেছে, রাষ্ট্রপতি তাঁর সব কার্য পালনে মন্ত্রিসভা কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে চলবেন। আসিফ আলী জারদারি আর বাংলাদেশের ‘কবরস্থানের ফাতেহা পাঠের’ নন। সংবিধান স্পষ্ট বলেছে, যেসব স্থানে নির্দিষ্টভাবে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দিয়েছে সেসব ক্ষেত্রে তিনি ডিসক্রিশন বা একক কর্তৃত্বে চলবেন, সে ক্ষেত্রে তিনি প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার পরামর্শ নেবেন না। আর সেই দায়িত্ব পালনসংক্রান্ত কোনো ধরনের বৈধতার প্রশ্ন কোনো কারণেই তোলা যাবে না। কোনো আদালতই প্রশ্ন করতে পারবেন না মন্ত্রিসভা বা প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে কী পরামর্শ দিয়েছেন। 
পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের জন্য অপেক্ষায় থাকব, তাঁরা কীভাবে এসব অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়ে গিলানিকে দণ্ড দিয়েছেন। শুধু নাম সুপ্রিম কোর্ট বলেই তাঁরা যা খুশি তা-ই করতে পারেন না। ব্যক্তির অজ্ঞতা, হঠকারিতা ও স্বেচ্ছাচারিতার যোগফল ‘আদালত অবমাননা’ বলে গণ্য হতে পারে না। বিশ্বের সব সমাজে গণতন্ত্র ও বাকস্বাধীনতার আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ‘আদালত অবমাননা’ সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। 
সুইস আদালতে একজন কর্মরত রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মামলা পুনরায় চালু করতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শুধু রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তিসংক্রান্ত ২৪৮ অনুচ্ছেদ কেন, উক্ত ৪৮ অনুচ্ছেদও মানবেন। সুতরাং প্রশ্ন হলো, সুপ্রিম কোর্ট ২৪৮ ও ৪৮ অনুচ্ছেদের কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আপাতদৃষ্টিতে সংবিধানের লঙ্ঘন ঘটে এমন আদেশ আদৌ দিতে পারেন কি না। এবং তা দিলেও প্রধানমন্ত্রী তা মানতে বাধ্য কি না। 
আমি মনে করি না যে সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী আপনাআপনি বৈধতা হারিয়েছেন। স্পিকারও প্রধানমন্ত্রীকে অপসারণের উদ্যোগ নিতে পারবেন না পূর্ণাঙ্গ রায় ও আপিলে সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত। আদালত নয়, গিলানির অপসারণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মজলিস ই শুরা (সংসদ)।
স্যার আইভর জেনিংসের একটি উক্তি মনে পড়ছে। তিনি পাকিস্তানের প্রথম সংবিধান তৈরির জন্য গঠিত কমিশনের উপদেষ্টা ছিলেন। ‘কোনো সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যদি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে তাহলে তাঁর ক্ষমতা এতটাই অপ্রতিরোধ্য যে রোম সম্রাটও তাঁকে ঈর্ষা করবেন।’ 
পাকিস্তানের বিচার বিভাগের কাছ থেকে এমন সক্রিয়তা চাই না যা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দেয়। বন্দুকের নলের পরিবর্তে আদালতের কলমের খোঁচায় নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ বেশি মহীয়ান কিনা, সেই কূটতর্ক বৃথা। পাকিস্তানের জনগণ বন্দুকের দুঃস্বপ্ন ভুলে একজন গিলানিকে ইতিহাসের দীর্ঘকালীন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকিয়ে রেখেছে। 
ওই বেঞ্চটি ভাগ্যিস গিলানিকে তিন মাস বা ছয় মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ খেলায় অবতীর্ণ হয়নি। অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। আদালত সর্বতোভাবে একটি এখতিয়ারবহির্ভূত বিষয় অনুশীলন করেছেন কিনা, তা পূর্ণাঙ্গ রায়ের পরে বলার সুযোগ পাব। তবে নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন সত্যি হলে আদালত নিশ্চিতই অপ্রয়োজনীয় বিষয় চর্চা করেছেন। কারণ, সুইস প্রসিকিউটররা সাফ বলেছেন, গিলানি যদি চিঠি লিখতেনও, তাহলেও তাঁরা ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত চালাতে অক্ষম থাকতেন। 
ধরা যাক গিলানি চলে গেলেন। পিপিপি নতুন প্রধানমন্ত্রী আনল। তাহলে তো তখনো আদালত অবমাননা ঘটতে পারে। তখন সুপ্রিম কোর্ট কী করবেন? গিলানি আপিল করলে সুপ্রিম কোর্ট এ ক্ষেত্রে ‘ডক্টরিন অব প্রসপেক্টিভ ওভাররুলিং’ (আদালতের আদেশ ভবিষ্যতে কার্যকর হবে) প্রয়োগ করতে পারেন। আসিফ জারদারির ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ামাত্রই সুইসদের কাছে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার চিঠি পাঠাবে। এটা বাধ্যতামূলক করে রায় লেখা সম্ভব। পাকিস্তানের জনগণের মতো আমরাও আমজনতার প্রাণের টুকরা ‘গণতন্ত্রের প্রাচ্যকন্যাদের’ (বেনজিরের বইয়ের নাম ডটার অব দি ইস্ট) গোপন রত্নভান্ডার সম্পর্কে তথ্য জানতে এবং তার দায়ে দোষীদের দণ্ড চাই। 
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১২

Keep Bangabhaban door open






The optimism in our political horizon set in motion by the presidential dialogue should not come to a halt only after reconstituting the Election Commission (EC). The proposed legislation for a search committee under Article 118 of the Constitution is a welcome development, although it might be of little help in overcoming our political impasse.
It is the responsibility of the contending parties to make the presidential palace a lighthouse. The door of the Bangabhaban must be open since the opposition feels uncomfortable on the parliament floor.
The most significant outcome of the dialogue so far is the indications of willingness by the ruling party to talk about the caretaker government. LGRD Minister Syed Ashraful Islam said that they would welcome "any initiative" taken by the president for holding free and fair polls. "Any initiative" is a ray of hope that reminded me of the Clause 5 of Article 48 of the Constitution, which was hardly invoked in Bangladesh.
Clause 5 of Article 48 says that the prime minister shall submit for the consideration of the cabinet ''any matter'' which the president may request him/her to refer to it. There are a few constitutional options that warranted the attention of the president. One of them will be discussed. He will need to examine the full verdict of the apex court, which is yet to be written.
The Daily Star editorial (November 29, 2011) rightly relied upon the essence of short order of the apex court which validated tenth and eleventh parliamentary elections under the 13th Amendment. The Daily Star response came following a remark made by Justice M.H. Rahman, who said that "self respecting nations cannot adhere to the caretaker system." Thanks to his consideration that he did not use "self respecting leaders."
Interestingly, The Daily Star highlighted a report titled ''Caretaker illegal right after the verdict'' on its front page on June 17, 2011. The short order said: ''The 13th Amendment is prospectively declared void and ultra vires the Constitution."
The Daily Star's interpretation of ''prospectively'' contradicted the arguments advanced by the opposition leader. Eminent experts said the word "prospectively" meant that the declaration became effective the moment the apex court announced it. However, a lead item appeared on the same day's newspaper titled ''PM interpreted verdict wrongly." Backed by Barrister Moudud Ahmed, the former PM argued that "prospectively" meant that the illegality of the caretaker would not be effective immediately.
The PM took the decision to repeal the CTG, overriding the draft of the Special Parliamentary Committee which only recommended minor amendments of the CTG in light of the verdict.
On the meaning and scope of "prospectively," I talked with five law experts in June -- former Chief Justice Mostafa Kamal, Mahmudul Islam, Dr. M Zahir, Dr. Shahdhin Malik and the Attorney General Mahbubey Alam. As I understand, there are different opinions but consensus on two counts. All at least agreed that the short order was ambiguous and their opinion should not be taken as conclusive since the full verdict was still to be published. Dr. Kamal Hossain told me he would go for review of the 13th Amendment verdict if necessary.
The Supreme Court of India (SCI) first invoked the "doctrine of prospective overruling" in 1967 in the famous Golaknath case ''in the context of invalidity of certain constitutional amendments and extended gradually to the laws found unconstitutional or even to the interpretation of ordinary statutes.''
A 1994 SCI ruling said: "It is now well settled that courts can make the law laid down by them prospective in operation to prevent unsettlement of the settled positions, to prevent administrative chaos and to meet the ends of justice."
In Bangladesh, the apex court never discussed this great harmonising principle; invoked only in our 8th Amendment. Mahmudul Islam discussed this briefly in his book "The Constitutional Law of Bangladesh."
Senior advocate M.I. Farooki, the petitioner's lawyer in the 13th Amendment case, confirmed to me that the Golaknath case was merely mentioned in the hearing, though its ''elasticity'' and its extent were not discussed. The SCI in Saurabh Choudhury v. Union of India (2004) held: "Prospective application of a judgment by the court must, therefore, be expressly stated." It is expected that the full verdict has fixed the terms and conditions quite precisely about the two term election which the apex court had envisioned in the time tested Latin maxims such as ''quod alias non est licitum, necessitas licitum facit (that which otherwise is not lawful, necessity makes lawful)."
The significance of reconstitution of the EC through a search committee is paramount, though the stalemate will not end. BNP should not oppose the reconstitution process considering it as a routine constitutional imperative.
Let these dialogues be carried on to the 2013 general election. The president has absolute power to appoint a PM. There should not be any misconception about the privilege and constitutional authority of our ceremonial head. It does not matter that his "hands are tied." Our president has four conventional rights. The right to be consulted, the right to warn, the right to encourage and the right to put forward his opinions to the PM even though he may eventually be bound to act on her advice.
The president has every legitimate right to enquire about the progress of the verdict since the majority of the parties that were invited to the dialogue suggested restoration of the caretaker system.
The writer is a journalist.

রবিবার, ২২ এপ্রিল, ২০১২

মন্ত্রিসভার বৈধতা ও শহীদ সোলেমান পরিবারের প্রার্থনা



ভারপ্রাপ্ত রেলমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কালো বিড়ালকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিড়াল কালো কি ধলা, সেটা বড় প্রশ্ন নয়। বিড়াল ইঁদুর ধরে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। বোঝা যাচ্ছে, বিড়ালবিষয়ক গল্প আর ফুরাবে না। এ দেশের ইঁদুরেরাই বিড়াল ধরছে!
প্রধানমন্ত্রী মিডিয়ার সমালোচনা করছেন। অথচ তিনি নিজেই ভুল ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মন্ত্রীদের পদত্যাগকেও তিনি সম্ভবত ৪৮(৩) অনুচ্ছেদের চশমায় দেখছেন। প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া আর সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে চলতে হয়। কিন্তু মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ তাঁদের কারও ইচ্ছাধীন নয়।
দলীয় সাংসদদের পদত্যাগপত্র নেত্রীর দেরাজে ফেলে রাখার রাজনীতির সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু সেটা এখানে খাটবে না। মন্ত্রীকে শুধু ‘পদত্যাগপত্র প্রদান’ করতে হয়।
তবে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দপ্তরবিহীন মন্ত্রিত্ব তাঁর নৈতিক রাজনৈতিক কফিনে আরেকটি পেরেক ঠুকেছে। প্রধানমন্ত্রী কোন দোষে মিডিয়ার সমালোচনা করলেন? তিনি নিশ্চয় বলবেন না যে সুরঞ্জিত পদত্যাগ নয়, পদত্যাগের অভিনয় করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার স্বচ্ছতায় বিশ্বাস করে। সুরঞ্জিত “স্বেচ্ছায়” পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তিনি তা রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠাননি।’ এ প্রসঙ্গে তিনি সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র ফেলে রাখার কথাও উল্লেখ করেন। এই যুক্তি সংবিধান পরিপন্থী।
সংবিধান কেবল একটি ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে কোনো মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটাতে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার দিয়েছে। যদি তিনি সুরঞ্জিতকে পদত্যাগ করতে অনুরোধ করতেন এবং তিনি তা পালনে অসমর্থ হতেন, তাহলে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়ার কথা আসত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, সুরঞ্জিত ‘স্বেচ্ছায়’ পদত্যাগ করেন। সোহেল তাজও স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সংবিধানের ৫৮(১) অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপদফাটি প্রযোজ্য। এখানে বলা আছে, ‘কোনো মন্ত্রীর পদ শূন্য হবে যদি তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’ সংবিধানে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা না করার কোনো সুযোগ কারও জন্য রাখেনি। আমাদের সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামও তা নিশ্চিত করেন।
সুতরাং সুরঞ্জিত ও সোহেল তাজ যে তারিখে ‘পদত্যাগপত্র প্রদান’ করেছেন, সেই তারিখেই তা কার্যকর হয়েছে। এখন তাঁদের ব্যাংক হিসাবে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বেতন-ভাতা জমা হওয়া একটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম। মহাহিসাব নিরীক্ষকের কাছ থেকে এ বিষয়ে আমরা একটি জনবিবৃতি অবিলম্বে আশা করি।
পদত্যাগী সুরঞ্জিতকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করার ঘটনাটি এটাও প্রমাণ করে যে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের নামে স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। আইনকানুনের যেন কোনো বালাই নেই। পদত্যাগী মন্ত্রীর পক্ষে ক্ষমতাসীনদের ত্যাগের মহিমা কীর্তনের রেশ তখনো মিলিয়ে যায়নি। ৩২ ঘণ্টা না পেরোতেই তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী করা এক মস্ত প্রহসন। প্রধানমন্ত্রী চাপে বা ঠেকায় পড়ে, যে কারণেই এই সিদ্ধান্ত নিন না কেন, এত বড় রাজনৈতিক প্রহসন বাংলাদেশের ইতিহাসেও নজিরবিহীন। এতে পদত্যাগী মন্ত্রীর একার নয়, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এটা রাজনৈতিক অর্থে অবশ্যই, আইনগত অর্থে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। গোটা মন্ত্রিসভার নৈতিকতা কিংবা বৈধতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ। মন্ত্রিসভা এখন ‘কোরাম নন জুডিস’ বা যথাযথভাবে গঠিত নয়। দীর্ঘ নীরবতা ও গোপনীয়তার পর প্রধানমন্ত্রী বললেন, সোহেল তাজ এখনো প্রতিমন্ত্রী। তাই বলি, সুরঞ্জিত ও তাজের মন্ত্রিত্বের বৈধতা আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য কি না।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র প্রেরণের কথা জাতিকে জানিয়েছিলেন। তাহলে তাঁকে নতুন করে শপথ নিতে হবে। তাঁকে পুনর্নিয়োগ দিতে হবে। আমরা তাঁর ‘ঐতিহাসিক’ পদত্যাগপত্রটি জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানাই।

২.
২৫ মার্চ ১৯৭১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আরও অনেকের সঙ্গে শহীদ হয়েছেন সোলেমান খান। আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস অতিক্রমকালে শহীদদের একটি তালিকা লক্ষ করে থাকবেন। এই তালিকায় সোলেমান খানের নাম আছে। সোলেমান ছিলেন রোকেয়া হলের দ্বাররক্ষী। তাঁর স্ত্রী ফুলমতী ১৯৮১ সালে মারা যান। শহীদ পরিবার হিসেবে তারা কখনো রাষ্ট্রের আনুকূল্য পায়নি। রাষ্ট্রের কখনো এই অভাজন শহীদ পরিবারের খোঁজখবর নেওয়ার দরকার পড়েনি।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘মোরগ’ কবিতাটি স্মরণে আসছে। তাঁর কবিতার ‘মোরগ’ খাদ্য সন্ধানে কখনোই খাবার ঘরে ঢুকতে পারেনি। কিন্তু একদিন সেই সুযোগ সত্যিই এসেছে। কিন্তু ‘খাবার খেতে নয়, টেবিলে খাবার হয়ে।’ ওই অচেনা শহীদ সোলেমান খানের ভাতিজাই হলেন রেলগেট কেলেঙ্কারির আলোচিত চালক আলী আজম খান, যিনি যে কারণেই হোক বিজিবি গেটে গাড়ি ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।
আমাদের একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থা ঘটা করে এপিএসের জবানবন্দি নিচ্ছে। খুব স্বচ্ছ তারা, তাই জনগণকে তারা অন্ধকারে রাখতে চায় না। সে কারণে চাকরিচ্যুত এপিএসের বরাতে খবর ছাপা হচ্ছে, দাদা নির্দোষ। কিন্তু তাঁর চালক কোথায়, সেটা কোনো রাষ্ট্রীয় সংস্থা বলছে না। প্রধানমন্ত্রীর উল্লিখিত স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে অভাজন আজমদের কোনো জায়গা নেই। ইলিয়াস আলীর জন্য কাল হরতাল হবে, কিন্তু আজমের কথা বলার কেউ নেই।
আমরা অবশ্যই কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করব, আজম যেন তাঁর স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে নিয়ে নিরাপদে থাকেন। আলী রীয়াজের ‘হুইসেল ব্লোয়ার’ তিনি না হতে পারেন, কিন্তু তাঁর কারণেই আমরা কার্পেটের তলাটা দেখলাম। তিনি অবশ্য প্রাণে বাঁচলেও তাঁকে কঠিন মাশুল দিতে হতে পারে। যেটুকু সত্য আমরা জেনেছি, এর চেয়ে বেশি কিছু জানানো দৃশ্যত এই রাষ্ট্রের সাধ্যের বাইরে। তাঁকে রাজসাক্ষী করার পরিবেশ কি বাংলাদেশে আছে?
একটি টিভি চ্যানেলের একজন সংবাদদাতা বৃহস্পতিবার আমাকে বলেন, নববর্ষের দিনে আলী আজম তাঁকে ফোন দেন। তবে মুখোমুখি নয়। গলাটা তাঁর চেনা মনে হয়েছে। ঘটনার দিন তাঁর সঙ্গে দুবার তাঁর ফোনে কথা হয়েছিল পিলখানায়। তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে দিতে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন। এপিএস চক্রের জন্য পিলখানা সরাইখানা হওয়ার কথা ছিল না। বিজিবির প্রধান বলেছেন, আলী আজমকে অন্যদের সঙ্গে ১০ এপ্রিল সকালেই ছেড়ে দিয়েছেন। সুতরাং মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার আর কিছু বলার নেই। রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত হয়তো জানেই না আলী আজম শহীদ পরিবারের সদস্য। অন্তত মতলব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে তেমনই মনে হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, আলী আজমের বিষয়ে লোকমুখে খোঁজখবর নিয়েছেন। কিন্তু থানার কোনো প্রাণী তাঁর বাড়ি সফর করেনি।
শহীদ সোলেমানের স্ত্রী ফুলমতীকে বিয়ে করেছিলেন আলী আজমের আরেক চাচা বেলাল হোসেন। তিনি স্থানীয় বিএনপির নেতা এবং ইউপি সদস্য। ১৯ এপ্রিল টেলিফোনে তিনি বলেন, ‘আলী আজম বেঁচে আছে কি মরে গেছে, তা আমরা জানি না। বাংলাদেশের পতাকার সঙ্গে আমাদের রক্ত মেশা। আমরা তো কিছুই পাইনি। আজ আবার নতুন করে হারাবার ভয়ে আছি।’
বেলাল হোসেন অবশ্য নিশ্চিত করেন যে আলী আজমের পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ৫ নম্বর উপাদী উত্তর ইউনিয়নটি মতলবের দক্ষিণে অবস্থিত। এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিনও স্থানীয় বিএনপির নেতা। তিনি অকপটে বললেন, ‘আলী আজমরা সব সময় আওয়ামী লীগকেই ভোট দিয়ে আসছেন। কিন্তু আমি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলব, এই অঞ্চলের সব মানুষ আলী আজমের পরিবারকে সম্ভ্রান্ত ও সৎ হিসেবে জানে।’ আমাদের চাঁদপুর প্রতিনিধি আলম পলাশ ১৬ এপ্রিল কথা বলেছিলেন আলী আজমের বাবা দুদ মিয়ার (৭২) সঙ্গে। তখন আজমের মা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। বলেছিলেন, ওর মুখটা একটু দেখতে চাই। দুদ মিয়ার কর্মক্ষেত্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। তিনি পরিবহন পুলে ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি চালাতেন। দুদ মিয়া তাঁর ছেলের নিরাপত্তার বিষয়ে হয়তো একটু বিশেষ অনুকম্পা লাভের জন্য ফিকে হয়ে যাওয়া একচিলতে স্মৃতি রোমন্থন করছেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার ছাত্রীজীবনে তাঁর ফুট-ফরমায়েশ খাটার সুযোগ হয়েছিল দুদ মিয়ার।
আলী আজম তাঁর শিশুকন্যা ও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় থাকতেন। একটি শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে আমরা তাঁর বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই। যাঁর কারণে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্প ঘটে গেল, তাঁর বিষয়ে রাষ্ট্রের নির্লিপ্ততা অমঙ্গলজনক। এপিএস যেভাবে ধোয়া তুলসীপাতার কাহিনি সাজাচ্ছেন, তা রাষ্ট্রীয় কলকারখানায় প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেলে আলী আজমকেই হয়তো কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে। কারণ, আলী আজম গরিব। তদবির করার মানুষ তাঁর জুটবে না। শহীদ পরিবার বলতে আবেগে যাঁদের কণ্ঠ বুজে আসে, তাঁরা কি কেউ শহীদ সোলেমানের ভাতিজার পাশে দাঁড়াবেন?

৩.
রক্ষণশীল দলীয় টমাস ডাগডেলকে উইনস্টন চার্চিল কৃষিমন্ত্রী করেছিলেন। ক্রিচেল ডাউন নামের একটি কৃষিজমি প্রতিরক্ষা বিভাগ অধিগ্রহণ করেছিল। প্রক্রিয়াটি বৈধ ছিল না। আমলাবিদ্বেষী তদন্ত কমিটি মন্ত্রীকে বাঁচিয়ে দিল। শুধু কর্মকর্তাদের দোষী করল। তদুপরি ডাগডেল তাঁর মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেন। অন্যের ব্যর্থতাও যে মন্ত্রীর দায়বদ্ধতার মধ্যে পড়ে, সেই দৃষ্টান্ত ডাগডেল। ব্রিটেনের ইতিহাসে তাই নীতিনৈতিকতার কোনো প্রশ্নে মন্ত্রীর পদত্যাগ প্রসঙ্গ এলেই তাঁর নামই বেশি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। এখানে একটি মজাও আছে। ৩০ বছর পরে প্রকাশিত দলিলে দেখা যায়, তদন্ত কমিটি পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। মন্ত্রীর লিখিত অনুমোদনে ওই কৃষিজমি হস্তান্তর হয়েছিল। ডাগডেল আসলে বিবেকের তাড়নায় মন্ত্রিত্ব ছেড়েছিলেন।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছিলেন, তিনি রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সমস্ত ব্যর্থতার দায়দায়িত্ব মাথায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। রেলগেট কেলেঙ্কারির জন্য গঠিত কোনো তদন্ত কমিটি যদি এপিএস ও আমলাদের দায়ী করেও, তবু তার দায় মন্ত্রীর ওপর বর্তাবে। এমনকি পুরো ঘটনা তাঁর অজান্তে ঘটলেও। এটা আইন নয়, ওয়েস্টমিনস্টার রীতি। তবে আমাদের ‘নখদন্তহীন’ তদন্ত কমিটি এপিএসের বিপুল অর্থের উৎস এবং ‘নিয়োগ-বাণিজ্য রহস্য’ উদ্ঘাটন করতে পারবে বলে তেমন ভরসা পাই না।
ভারতের রেলমন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদির পদত্যাগ নিয়ে গত ১৫ মার্চ বিরোধী দল সরকারের কাছে রাজ্যসভায় বিবৃতি চেয়ে ঝড় তুলেছিল। আমরা সংসদে সরকারের কাছ থেকে বিবৃতি চাই। বিএনপি সেই দাবি তুলতে পারে। এটা প্রতিষ্ঠিত সংসদীয় রেওয়াজ। এমনকি পদত্যাগী মন্ত্রীও বিবৃতি দিতে পারেন। সাংসদেরা সে জন্য নোটিশ দিতে পারেন। স্পিকার অবশ্য পদত্যাগী মন্ত্রীকে বিবৃতি দিতে বাধ্য করতে পারেন না। ১৯৭৮ সালে লোকসভায় পদত্যাগী মন্ত্রীর বিবৃতির পর ভারতের প্রধানমন্ত্রীও তাঁর সহকর্মীর পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করেছিলেন। ওই বিবৃতি মন্ত্রীর পদত্যাগের ছয় মাস পরে এসেছিল। আমাদের অত দেরি করতে হবে না। সামনেই বাজেট অধিবেশন।
 মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

রবিবার, ৮ এপ্রিল, ২০১২

সৌদি কর্মকর্তা খালাফের খুনি কে?


বন্ধুপ্রতিম দেশ সৌদি দূতাবাসের কর্মকর্তা খালাফ বিন মোহাম্মদ সালেম আল-আলী হত্যারহস্যের জট যে এখনো খোলেনি, সেটা অবশ্যই পরিতাপের। তদন্তকারীরা আমাদের অন্ধকারে রাখছেন। কে খুনি? কেন এই খুন? এর কোনো ইঙ্গিতও মিলছে না। তাই বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর টুইটারে ইরানকে ইঙ্গিত করা মন্ত্যবটি নিয়ে আলোচনা প্রাসঙ্গিক মনে হলো। উপরন্তু ওয়াকিফহাল একজন কূটনীতিকের সঙ্গে আলোচনার পরে তিনি জানালেন, কুয়েত টাইমস-এও এমন একটি ইঙ্গিতপূর্ণ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এমনকি কুয়েতের উপপ্রধানমন্ত্রী স্বয়ং সেই ইঙ্গিত করেছেন বলে পত্রিকাটির দাবি। বাংলাদেশি কূটনীতিকেরা এ বিষয়ে হয়তো সংগত কারণেই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন। অবশ্য একজন কূটনীতিক বললেন, ‘এটা কোনো সাধারণ খুনের ঘটনা নয়, তুচ্ছ কারণে নয়।’
সফররত সৌদি প্রতিনিধিদল তদন্তের জন্য আসেনি বলে সরকারের প্রকাশ্য বিবৃতি দেওয়া যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য বা প্রয়োজনীয় ছিল বলে মনে হয় না। এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে তারা রুটিন সফরে আসেনি। পুরো বিষয়টি যাচাই করে তারা দেখবেই। তারা যেন আমাদের ফৌজদারি আমলাতন্ত্রের পাঁকে না পড়ে। এ ক্ষেত্রে অবহেলা বা গাফিলতির অভিযোগ কিংবা তা বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতীয়মান হলে তা সৌদি-প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনঃকষ্টের কারণ হবে। অর্ধডজন মন্ত্রীর খালাফের জানাজায় শামিল, বিমানবন্দরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর গমন এবং রিয়াদে তাঁর বিশেষ সফর রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব প্রদান বোধগম্য।
সৌদি সরকার দুই দেশের সম্পর্কে এর কোনো ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছে। তদুপরি ৪ এপ্রিল আরব নিউজ পত্রিকায় রিয়াদ ডেটলাইনে গজনফর আলী খানের একটি প্রতিবেদন বেশ অস্বস্তিকর। ৩৭ বছরের পুরোনো ইংরেজি ভাষার এই দৈনিক পত্রিকা দেখভাল করেন সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ছেলে প্রিন্স ফয়সাল বিন আবদুল আজিজ। ‘ঢাকায় সৌদি কূটনীতিক হত্যাকাণ্ডে কোনো ক্লু মেলেনি’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনের শিরোনাম সঠিক। গুলশান থানার পুলিশ প্রাথমিক ও র‌্যাবের ছায়া তদন্তের পর ডিবি মূল তদন্ত করছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এর কোনো অগ্রগতি নেই। তবে অস্বস্তির বিষয়টি আগে বলে নিই। আরব নিউজ বলছে এবং এর আগেও সৌদিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখেছি যে বাংলাদেশ এর তদন্তে ব্যর্থ হলে ঢাকা-রিয়াদ সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেবে।
কূটনীতিক খালাফ হত্যার ঘটনা যেদিন প্রথম আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ল, তখন অস্বস্তির সঙ্গে লক্ষ করেছিলাম, বিবিসি, সিএনএন হত্যাকাণ্ডের পটভূমি হিসেবে ঢাকা-রিয়াদ সম্পর্কের টানাপোড়েন স্মরণ করে। এবং তারা সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের শিরশ্ছেদের ঘটনায় ঢাকার উদ্বেগ প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করে। অবশ্য ৬ মার্চ এপি এ প্রসঙ্গে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যার চেষ্টায় ইরানকে অভিযুক্ত করা, করাচিতে সৌদি কূটনীতিককে হত্যা, ভারত, থাইল্যান্ড ও জর্জিয়ায় ইসরায়েলি কূটনীতিকদের ওপর হামলার চেষ্টায় ইরানকে দোষারোপ এবং সিরীয় বিদ্রোহীদের অস্ত্র জোগাতে সৌদি পরিকল্পনায় ইরানের ক্ষুব্ধ হওয়ার কথা তোলে।
তবে এর সবটাই ছাপিয়ে যায় বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ খালেদ বিন আহমেদ আল খলিফার মন্তব্যে। তিনি টুইটারে লেখেন, ‘ঢাকায় সৌদি কূটনীতিককে হত্যা একটি উন্মুক্ত যুদ্ধের অংশ এবং অপরাধী চিহ্নিত।’ তিনি একজন পেশাদার কূটনীতিক। টেক্সাসের সেন্ট এডওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টারের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে যুক্ত হয়েছিলেন। সৌদি আরবের সঙ্গে তাঁর সখ্য নিবিড়। বাহরাইনেও আরব বসন্তের ছোঁয়া লেগেছিল। একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০ ব্যক্তিকে হত্যার জন্য সরকারি বাহিনীকেই দায়ী করেছিল। বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক শিয়া। কিন্তু রাজতন্ত্র সুন্নি। এমনও খবর বেরিয়েছে যে সুন্নিদের সংখ্যা বাড়াতে বাহরাইন পাকিস্তান ও সিরিয়া থেকে লোকবল আমদানি করছে।
গত বছর করাচিতে সৌদি কূটনীতিককে হত্যার পর পাকিস্তানের পুলিশ বলেছিল, ‘হত্যাকারী জঙ্গিরা বাহরাইনে সৌদি সৈন্য পাঠানোর কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওই কাণ্ড ঘটায়। আল-কায়েদা ঘোষণা দিয়েছিল, ‘আমরা এর দায়িত্ব নিচ্ছি। যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকা আল-কায়েদার পিছু না ছাড়ছে এবং বিমান হামলা বন্ধ না করছে, ততক্ষণ আমরা এ ধরনের হামলা চালিয়ে যাব।’ দুজন মোটরসাইকেল আরোহী করাচিতে সৌদি কূটনীতিক হাসানকে গুলি করে পালিয়ে যায়।
উল্লেখ্য, বাহরাইনের বসন্তে ইরানের মদদ ছিল বলে অভিযোগ করেছিল ক্ষমতাসীনেরা। বিরোধীদলীয় শিয়া নেতারা তা অস্বীকার করেন। ইরান মনে করে, ঐতিহাসিকভাবে বাহরাইন তাদের প্রদেশ। কিন্তু আমাদের প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশি রাজনীতিকদের মতো বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাগাড়ম্বর করেছেন কি না। কুয়েতের সঙ্গেও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ভালো নয়। গত বছরও কুয়েত-ইরান পাল্টাপাল্টি কূটনীতিক বহিষ্কার করেছে।
ইরান ও সৌদি আরবের মাঝখানে বাহরাইনে বসে আছে পঞ্চম নৌবহর, যার কাজ মূলত ইরানকে সামলানো। বাহরাইনে রক্তাক্ত বসন্তের পটভূমিতে গত বছরের মার্চে সৌদি আরব সে দেশে সৈন্য পাঠায়। ইরানের প্রতি চরম অসন্তোষ প্রকাশে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহর অবস্থান কোনো গোপন বিষয় নয়। উইকিলিকস সূত্রে একটি বার্তা বিশেষভাবে রটেছে যে বাদশাহ আবদুল্লাহ ইরানকে ইঙ্গিত করে যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছেন, ‘সাপের মাথা অবশ্যই কেটে ফেলতে হবে।’
গত অক্টোবরে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘ইরান সরকারের দ্বারা ওই সৌদি রাষ্ট্রদূত হত্যার প্রচেষ্টা অনুমোদিত ও পরিচালিত হয়েছিল। দেড় মিলিয়ন ডলার দিয়ে মেক্সিকোর একটি মাদক মাফিয়া চক্রকে ঘাতক হিসেবে ভাড়া করা হয়েছিল।’ নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই ষড়যন্ত্রের আওতায় ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাস এবং আর্জেন্টিনা ও সৌদি দূতাবাস বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল বলে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ খাজায়ি এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ইরানের তরফেও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের তির যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে রয়েছে। গত জানুয়ারিতে একজন ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানি তেহরানে এক গাড়িবোমা বিস্ফোরণে নিহত হলে ইরান এর জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করে।
ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন কবি, লেখক ও সাংবাদিক মিজ রয় হাকাকিয়ান মনে করেন, বিদেশে বসবাসরত শত্রু খতম প্রচেষ্টায় ইরানের ইসলামি সরকারের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯২ সালে বার্লিনের একটি রেস্তোঁরায় নিহত চার ইরানিকে নিয়ে লেখা তাঁর বইয়ের নাম অ্যাসাসিনস অব দ্য তারকুইজ প্যালেস। জার্মানির এক আদালত বলেছেন, ওই চারজনকে হত্যায় ইরান সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমোদন ছিল। হাকাকিয়ানের আরও দাবি, বার্লিনে ওই চারজনকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত বন্দুকধারীর বিরুদ্ধে সুইডেনে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ছিল। সুতরাং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রেক্ষাপটে আমরা বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ‘উন্মুক্ত যুদ্ধ’কে অনুভব করতে পারি। কিন্তু আমরা সন্দেহের বশে অবশ্যই কোনো উপসংহারে পৌঁছাতে পারি না।
খালাফ হত্যার পর দেশি-বিদেশি মিডিয়ার হাবভাব কয়েক দিন পর্যবেক্ষণে রেখেছিলাম। একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, ঢাকার একটি ইসরায়েলভাবাপন্ন সাময়িকী খালাফ হত্যায় ইরানকে জড়িয়ে একটি খবর প্রচার করে। এতে নির্দিষ্ট কোনো সূত্রের উল্লেখ ছিল না। অথচ দেখলাম, সেই পত্রিকাটির বরাত দিয়ে প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক সৌদি গেজেট-এর একটি ব্যানার হেডলাইন খবরের শেষ অংশে ওই ইরানি যোগসূত্রের বিষয়টি জুড়ে দেওয়া হয়। রক্ষণশীল দেশ হলেও সৌদি আরবে আরবি ভাষায় বহুসংখ্যক অনলাইন পত্রিকা বেরোচ্ছে। হয়তো সেগুলো স্বল্প পরিচিত। কিন্তু ওই বাংলাদেশ সাময়িকীর বরাত দিয়ে বিপুলসংখ্যক অনলাইন আরবি প্রকাশনা ফলাও করে কথিত ইরানি সম্পৃক্ততা প্রকাশ করে। তবে কোথাও এটা দেখিনি যে কেউ নিজস্ব সূত্রের বরাত দিয়ে ইরানের প্রতি ইঙ্গিত করেছে।
পঁচাত্তরের পরে ইরানের শাহের মাধ্যমে বাংলাদেশে মার্কিন অস্ত্র সংগ্রহে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ ছিল। ইরাক-ইরান যুদ্ধ বন্ধে ঢাকার দূতিয়ালি ছিল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তেহরানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুব আশাব্যঞ্জক নয়। সেখানে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য নয়। তবু তারা বন্ধু দেশ। আমাদের ডিবি যখন খালাফ খুনের মোটিভ সম্পর্কে একেবারেই অন্ধকারে, তখন বিষয়টি আমরা আলোচনায় এনেছি মাত্র। তবে এর উদ্দেশ্য এই নয় যে অহেতুক ইরান বা অন্য দেশকে সন্দেহ করা।
সর্বশেষ জানা গেল, নিহত খালাফের ব্যক্তিগতবিষয়ক বা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে বিরোধের জের ধরে তিনি খুন হতে পারেন—এমন বিশ্বাসে ভর করেও তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। গুলির ধরনটি চৌকস, নিপুণ, আততায়ী আত্মবিশ্বাসী, তাঁর নিশানা ছিল অব্যর্থ। প্রথম আলোর অপরাধবিষয়ক বিশেষ সংবাদদাতা কামরুল হাসানের বর্ণনায়, ‘গুলিটা সম্ভবত গাড়িতে বসা অবস্থায় তাঁকে করা হয়। কণ্ঠ-অস্থি ভেদ করে গুলিটা তাঁর কিডনিতে আটকা পড়ে। গুলিটা খাড়া ছিল। গুলির শব্দ ও গাড়ি চলে যাওয়া প্রায় একই সময়ে ঘটে। তা ছাড়া দীর্ঘদেহী খালাফকে দাঁড়ানো অবস্থায় ওই স্থানে গড় উচ্চতাসম্পন্ন কোনো বাংলাদেশির গুলি করা সম্ভবও নয়।’
৪ এপ্রিল আরব নিউজ যা লিখেছে, তা বন্ধুপ্রতিম দুই দেশের কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ২০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। সৌদি আরব বাংলাদেশের বৃহত্তম সাহায্যদাতা। বাংলাদেশে সৌদি কূটনীতিক হত্যার ঘটনার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকার যদি সংক্ষিপ্ততম সময়ের মধ্যে অপরাধী শনাক্ত করতে না পারে, তাহলে সৌদি আরবে কর্মরত ২০ লাখ শ্রমিককে কেন্দ্র করে প্রকৃত সংকট শুরুর আশঙ্কা দেখা দেবে।’ প্রতিবেদক অবশ্য এরপর বাংলাদেশ যে ক্রমশ অপরাধীদের অভয়াশ্রমে পরিণত হচ্ছে, নাগরিক নিরাপত্তা যে বিঘ্নিত, সে কথা বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন।
কিন্তু যেটা বোধগম্য নয় সেটা হলো, প্রতিবেদক কী করে ২০ লাখ কর্মরত শ্রমিকের বিষয়টি খালাফ হত্যাকাণ্ডের বিলম্বিত তদন্তের সঙ্গে যুক্ত করলেন? এটা গ্রহণযোগ্য নয়। দুই দেশের সম্পর্ক তো শ্রম বিকিকিনি ও সৌদি অবকাঠোমো তথা তাদের অর্থনীতিতে আমাদের জনশক্তির ভূমিকা রাখার চেয়ে অনেক বেশি। প্রতিবছর আমাদের বিপুলসংখ্যক হজযাত্রীর পবিত্র গন্তব্য তো দুই দেশকে এক চিরকালীন অবিচ্ছেদ্য মেলবন্ধনে যুক্ত রেখেছে।
আমার সহকর্মী কামরুল হাসানের মন্তব্যের সঙ্গে আমি একমত যে খালাফ হত্যারহস্যের ন্যূনতম কোনো অগ্রগতি না হওয়াটা রহস্যজনক। ডিবির তদন্ত দলের কর্মদক্ষতা ও আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।

mrkhanbd@gmail.com


বুধবার, ৪ এপ্রিল, ২০১২

মাই লর্ড মেয়র মন্জুর আলম

চট্টগ্রামের মেয়রকে ‘মাই লর্ড মেয়র’ হিসেবে সম্বোধন করতে চাই। কারণ এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমরা একটি সামন্তসমাজের প্রতিচ্ছবি দেখি। দেখি তেমনই সমাজের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। ফিউডালিজমের বাংলা হলো সামন্ততন্ত্র। ১৬১৪ সালে শব্দটির প্রয়োগ শুরু। আপনারা লক্ষ করেছেন, স্থানীয় সরকারের নির্বাচন দলের প্রতীকে হয় না। তবুও আমরা দুই পরীক্ষিত বন্ধুর দেখা পাই। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও মন্জুর আলমকে রাজধানীতে আসতে দেখি। তাঁরা প্রধান দুই দলের নেতার কাছে দোয়া নিয়েছেন। জনাব চৌধুরী কায়ক্লেশে তাঁর সংশয়গ্রস্ত আনুগত্য নবায়ন করেন। মন্জুর আলম জিয়ার প্রথম সমাধি জিয়ারত করেন। তাঁর ভাইকেও বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে ফুল নিয়ে আনুগত্য প্রকাশ করতে দেখা যায়। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকলে তিনি নিজেই ছুটে আসতেন। এসব ঘটনা প্রমাণ দেয়, স্থানীয় নির্বাচন নয়, চট্টগ্রামে একটা কেন্দ্রীয় নির্বাচন হলো। আর এই কেন্দ্র কোনো রকম বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী নয়। 
মিলটা দেখুন। মধ্যযুগীয় সামন্তসমাজে লর্ড ছিল আভিজাত্যের প্রতীক। লর্ড কথাটি বহু দেশে বহু অর্থে ব্যবহূত হয়। আমাদের দেশে বিচারপতিদের লর্ড সম্বোধন করা হয়। তার উৎপত্তি সম্ভবত প্রাচীন জার্মান উপজাতীয় প্রথায়। এই লর্ড মানে ‘রুটিরক্ষক’। অস্ট্রেলিয়া, কানাডার প্রধান নগরপিতাদের এখনো বলা হয় লর্ড মেয়র। ব্রিটেনে রাজা ছিলেন প্রধান লর্ড। আমরা ব্রিটেনের বিবর্তন মনে রাখব। মন্জুর আলমকে লর্ড মেয়র সম্বোধন করলাম। সেটা ‘রাজার খাস ভাড়াটে’ অর্থে। মধ্যযুগীয় ব্রিটেনের অনুসরণে। 
রানি এলিজাবেথ আজও প্রধান লর্ড। কিন্তু ওই খোলসটুকু মাত্র। ভেতরে গণতন্ত্র। সামন্তসমাজে রাজাদের কাছে বিশ্বস্ততা ও আনুগত্যের শপথ নিতে হতো। জনগণ সেখানে অনুপস্থিত ছিল। চট্টগ্রামে মানুষ ভোট দিয়েছে। কিন্তু তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকবে। 
মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় সমাজে দুজন ব্যক্তির মধ্যে এই শপথ হতো। আমাদের সমাজেও এর বাস্তব অনুশীলন চলছে। মহিউদ্দিন ও মন্জুর ঢাকায় এসে শপথ নেন। এই শপথই আমাদের সমাজের চালিকাশক্তি মনে হয়। মধ্যযুগে যে আনুগত্য দেখাত, তাকে বলা হতো ‘ভেসাল’ বা দাসখতদাতা। যার কাছে শপথ বা দাসখত দেওয়া হতো, তাঁর ছিল লর্ড উপাধি। আমাদের সমাজে এখন লর্ড নেই। আছে অন্য নামে। এরাই ভাইয়া। চাচা। বড় ভাই। কখনো আপা, ম্যাডাম ইত্যাদি। ২২ জুন মন্জুর সাংবাদিকদের বলেন, মহিউদ্দিন চৌধুরীকে তিনি ‘আজীবন বড় ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা’ করেছেন। 
লর্ড-ভেসাল শপথের সময় একটি চুক্তি হতো। ভেসাল বলত, আপনার অবাধ্য হব না। লর্ড বলত, তোমাকে আমি সুরক্ষা দেব। রাতবিরাতে ফুলের তোড়া হাতে ছোটাছুটির মধ্যে আমরা উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে সেই মধ্যযুগীয় চুক্তির ছায়া দেখি। 
নির্বাচনের আগে দুই নেতা ঢাকায় ওই শপথ পাঠ করেন। নিঃশর্ত আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। এটা করতে তাঁরা বাধ্য ছিলেন। কারও পক্ষেই তা এড়ানো সম্ভব ছিল না। কারণ ক্ষমতার রাজনীতিটা চট্টগ্রামের মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে না। ভোটাররা সমাজ নিয়ন্ত্রণ করলে বাংলাদেশে গোত্র গণতন্ত্রের এতটা বাড়বাড়ন্ত হতো না। ঢাকায় ওই যে শপথ হলো, এর মাধ্যমে তারা আসলে চট্টগ্রামকে ‘ভেসেল স্টেট’ বা পুতুল নগরে নামিয়ে আনল। বড় নেতা-নেত্রীরা চাইবেন না, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় চাইবে না, অথচ স্থানীয় জনগণ চাইবে বলে সেটা মানতে হবে, সেটা হবে না। আর সেটা যখন হয় না বা নামকাওয়াস্তে কিছু হয়, তখন সেখানে স্থানীয় সরকার আর থাকে না। স্থানীয় শাসন কায়েমের প্রশ্ন মাঠে মারা পড়ে। 
চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে আমরা খোলস-গণতন্ত্রের মহড়া দেখি। কিন্তু গণতন্ত্রের বিজয় দেখি না। লাতিন শব্দ মেয়র। এর অর্থ মহত্তম। প্রায় ১১০০ বছর আগে এডওয়ার্ড দ্য এলডারের আমলে এই পদটির জন্ম। পরিহাস হলো, সম্রাটের অনুগত ও বিশ্বস্তরাই এ পদ পেতেন। আজও সেই আনুগত্যই বড় পরীক্ষা। প্রার্থী হতে হলে তা অর্জন করতে হবে। ভোটের পরে তাকে রক্ষা করতে হবে। 
১৮৮২ সালে ব্রিটেনে প্রথম মেয়র নির্বাচন আইন হয়। সে আইনে কিন্তু মেয়রের মেয়াদ এক বছর নির্দিষ্ট হয়। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যথাসময়ে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হতে হবে। আমার কাছে মনে হলো, কথাটা ১২৮ বছর দূর থেকে ভেসে এসেছে। মেয়াদ শেষে যাতে নির্বাচন না হয়, সে জন্য কৌশলের কোনো অভাব নেই। ওই আইনেই কিন্তু নির্দিষ্ট ছিল, প্রতিবছর ৯ নভেম্বর নির্বাচন হবে। ব্রিটেনের শুরুটা এমন ছিল। এখন কোথাও মেয়াদ বেড়েছে। ভাবুন তো, আমরা কেন গণতন্ত্র শেখার পর্বে এখন এমন আইন তৈরি করি না।
সব রকম উদাহরণই আছে। কোনটা আমরা নেব। দেখব। শিখব। সেটাই বড় বিষয়। ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে মেয়রের মেয়াদ ছয় বছরের। বেলজিয়াম অনির্দিষ্টকাল মেয়াদে। অনেক দেশে কেন্দ্রীয় সরকার মেয়র নিয়োগ দেয়। অনেক দেশে আমাদের মতো প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র হয়। তবে সাম্প্রতিক প্রবণতা হলো নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা মেয়র নির্বাচন। প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত মেয়রদের অনেকেই স্বৈরশাসক হয়ে উঠছেন। যে মডেলটা আমাদের দেশে এখন চলছে, সেটায় ত্যক্তবিরক্ত ব্রিটেন। একজন নির্বাচিত মেয়র, সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের একজন আমলা। দুজন মিলে কাউন্সিলরদের পাত্তা না দেওয়া। মহিউদ্দিন চৌধুরী তাঁর ১৭ বছরের অধিকাংশ সময় সম্ভবত এটাই চালিয়েছেন।
এক দশক ধরে ব্রিটেন এই প্রশ্নে অস্থিরতা দেখাচ্ছে। ৩৭টি স্থানে গণভোট হয়েছে। মাত্র ১২টিতে প্রত্যক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচন সমর্থিত হয়েছে। বাকি ২৫টিতে কাউন্সিলরদের ভোটে মেয়র নির্বাচনের পরোক্ষ ব্যবস্থা সমর্থিত হয়েছে। বাংলাদেশে এই পরোক্ষ ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তিন সদস্যের স্থানীয় সরকার কমিশন পরোক্ষ ভোটে মেয়র নির্বাচনের সুপারিশ করে। আওয়ামী লীগ এই বিধান বিলোপ করেছে। পরোক্ষ ভোট শুনলে অনেকে আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্রের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী তো পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। সেটা কি আইয়ুবের মডেল? এই তুলনা এখানে অপ্রাসঙ্গিক। 
গত ১৭ জুনের ভোটে শুধু কাউন্সিলর নির্বাচন হতে পারত। ৪১ জনের যে কেউ মেয়র হতে পারতেন। তখন মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আসত প্রতিটি ওয়ার্ড। গণমাধ্যম শুধু দুজনকে ঘিরে মাতামাতি করল। মোনায়েম খাঁ শুধু পিন্ডির মনোভঞ্জনে আগ্রহী ছিলেন। আমাদের এই ব্যবস্থায় ঢাকাকে বানালাম পিন্ডি। নব্য পিন্ডিকে সন্তুষ্ট রাখাটাই মাই লর্ড মেয়রের চ্যালেঞ্জ। এখানে বীরত্ব কিংবা অবাধ্যতার সুযোগ নেই। মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার কোনো ফাটাফাটির খবর নেই। ‘বিএনপির সময় যতটা স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করেছি, সেভাবে আমি আওয়ামী লীগের সময় পারিনি’, জনাব চৌধুরীর মুখে এ কথা বহুবার শোনা গেছে। ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেনকে নিয়ে শেখ হাসিনার আদৌ কোনো অস্বস্তি আছে বলে আমরা জানি না। 
আমি মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের সঙ্গে আমাদের বড়ই মিল পাই। তখন রাজারাই ছিলেন ফিউডাল লর্ড। কাউন্টরা (রাজার সহচর) উঁচুতে ছিলেন। সামন্ত প্রভুরা ছিল নিচু। কাউন্টরা অর্পিত ক্ষমতা (ডেলিগেটেড পাওয়ার) ভোগ করতেন। কিন্তু ফিউডাল লর্ডদের সেই সুযোগও ছিল না। দয়াপরবশ হয়ে রাজারা যতটুকু ক্ষমতা দিতেন, সেটুকুই তাঁদের ভোগ করতে হতো। আমাদের মেয়র, সাংসদ, উপজেলা চেয়ারম্যান, যেখানে যাঁর নাম যাই হোক, তাঁরা সেই ফিউডাল লর্ড। কেউ কাউন্ট। তবে একবিংশ শতাব্দীতে এই ভূখণ্ডে তাঁরা যে যাই হোন, জনগণের অর্পিত প্রকৃত দায়িত্ব তাঁরা পালন করেন না। সামন্ততন্ত্র আর গণতন্ত্র পাশাপাশি চলে না। উপজেলা প্রশাসনকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলে সামন্ততন্ত্রে কুঠারাঘাত পড়বে। তাই তা দেওয়া হয় না। স্থানীয় শাসনের উত্থান ঘটলে সংসদের মুখোশটা খুলে পড়বে। তাই স্বায়ত্তশাসনকে দুই বড় দল যমের মতো ভয় পাচ্ছে। দুদক, মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তথ্য কমিশন—সবটাকেই সুতো দিয়ে বাঁধার প্রবণতা। সবশেষ বিটিআরসিকে পদানত করার সূত্র ওই একই।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ঢাকাভিত্তিক সরকারের দয়াভিক্ষায় টিকে থাকে। অথচ প্রজাতন্ত্রের মালিকেরা তাদের স্বায়ত্তশাসন দিতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু মুজিবের সেই স্বায়ত্তশাসনের স্বাদ। প্রদেশ, রাজ্য বলা হয়নি ঠিকই, নামকরণ একটা করেছিল। ‘প্রশাসনিক একাংশ’। থমাস জেফারসন ও জেমস মেডিসনেরা অঙ্গরাষ্ট্রগুলোকে পতাকা দিয়েছিলেন। সংবিধান দিয়েছিলেন। আমাদের সংবিধানপ্রণেতারা অতটা ভাবেননি। তবে তাঁরা ছায়াটা নেন। কখনো মনে হয় সেটা দিলেই বুঝি ভালো হতো। বাংলাদেশে প্রদেশ ও ফেডারেল সরকার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি ভাবা যেতে পারে। চট্টগ্রামে ১৭ লাখ ভোটার। তরুণ ভোটার পাঁচ লাখ। ভুটানের লোকসংখ্যা সাত লাখ। চট্টগ্রাম মহানগরে লোকসংখ্যা প্রায় ২৬ লাখ। এর চেয়ে কম লোকসংখ্যার দেশের সংখ্যা ৮০টির বেশি হবে। 
প্রশ্ন হলো, আমাদের মাই লর্ড মেয়রগণ তাঁদের শহরগুলোকে প্রকারান্তরে আর কতকাল ভেসেল স্টেট হিসেবে গণ্য করে চলবেন? মোঙ্গল শাসক ও তাঁদের চেলাচামুণ্ডারা ছিলেন মারকুটে। নগরগুলোর লর্ডরা তা টের পেতেন। তাই তাঁদের নগর আক্রমণের আগেই আত্মসমর্পণ করতেন। এর মূলমন্ত্র ছিল একটাই—শর্তহীন আনুগত্য প্রদর্শন। এটাই লিটমাস টেস্ট। বাংলাদেশেও টেস্ট ওই একটাই।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর আনুগত্যবিচ্যুতি দেখা দিয়েছিল। তিনি অনেকগুলো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি নগর সরকারের স্বপ্ন দেখতেন। এসব বিষয় ওই আনুগত্যের সঙ্গে যায় না। মন্জুর আলম আনুগত্যের পরীক্ষায় এ পর্যন্ত উত্তীর্ণ। সেটা জনাব চৌধুরীরও জানা। মন্জুর আলম গত ২২ জুন জনাব চৌধুরীর বাসভবনে যান। জনাব চৌধুরীর শোবার ঘরে পর্যন্ত তাঁর প্রবেশাধিকার রয়েছে। সম্পর্কটা এমনই অন্তরঙ্গ। জনাব চৌধুরী তাঁর ১৭ বছরে মন্জুর আলমকে সর্বোচ্চ নয়বার ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্ব দেন। 
আমরা চট্টগ্রামের নগর-রাজনীতিতে কোনো মৌলিক গুণগত পরিবর্তন আশা করছি না। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসবে, গণতন্ত্র শুদ্ধকরণ প্রক্রিয়া চালু হবে—এসব অলীক স্বপ্ন। কিছু ক্ষেত্রে যা বিএনপি তা-ই আওয়ামী লীগ। মাই লর্ড মেয়র সে রকম একটি চরিত্র। তিনি তাঁর ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন। তাঁর পিতা একই ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। এর সুফল তিনি নেবেন। তাঁর ব্যক্তিগত সততার সুনাম আমরা শুনেছি। সে জন্য তাঁকে শ্রদ্ধা জানাই। মহিউদ্দিন ৫০ বছর আর নতুন মেয়র রাজনীতিতে আছেন ৪০ বছর। মহিউদ্দিন ‘আমৃত্যু’ রাজনীতি করবেন। জনাব আলমের সামনে সংসদ নির্বাচনের টিকিট ঝুলছে। তদবির করে আর হতাশ হতে হবে না। হয়তো তিনি কার কাছ থেকে নেবেন, সেটা একটা প্রশ্ন। 
মাই লর্ডকে প্রশ্ন করুন। কবে অবসর নেবেন। তিনি অবমাননা বোধ করবেন। মহিউদ্দিন সম্পদের বিবরণী দেননি। কাউন্সিলরদের কাছ থেকে আদায় করেননি। একই পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন নতুন মাই লর্ড। তাঁর ব্যক্তিগত সততা হয়তো থাকবে। কিন্তু উল্লিখিত লর্ড-ভেসেল শর্ত তাঁকে মানতে হবে। শর্ত ভাঙতে চাইলে তিনিই ভেঙে যাবেন। তেমন ঝুঁকি নেওয়ার লোক তিনি নন বলেই শুনিছি। চ্যালেঞ্জ নিতে সংকল্প হচ্ছে? আচ্ছা নিন। নাগরিকদের পক্ষে এই একটি কাজ করে দেখান। লর্ড-ভেসেলের সুতাটা ছিন্ন করুন। অবসরের ঘোষণা দিন কিংবা নিজের ও পোষ্যদের সম্পদ ও দায়দেনা এবং স্বার্থের সংঘাতের বিবরণী প্রকাশ করুন। মাই লর্ড মেয়র, আপনাকে আমরা অভিনন্দন জানাব। অপেক্ষায় রইলাম।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

নীরব ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত দুদক



মিজানুর রহমান খান
সেগুনবাগিচায় একটা ভূমিকম্প ঘটে গেছে। নীরবে। রিখটার স্কেলের সাত মাত্রার ভূমিকম্প হলে নাকি ঢাকার দালানকোঠা ধ্বংস হয়ে যাবে। প্রাকৃতিক ভূমিকম্প হলে ধ্বংসযজ্ঞ খালি চোখে দেখা যায়। কিন্তু এই ভূমিকম্প খালি চোখে দেখা যাবে না। সেগুনবাগিচায় দুদক ভবন। ভূমিকম্পটা সেখানে আঘাত হেনেছে। ধ্বংসযজ্ঞটা কল্পনা করতে হবে। 
রিখটার স্কেলটার নাম ডিসমিস। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর দুর্নীতির মামলায় হাইকোর্টে খালাস পান। এর বিরুদ্ধে দুদক লিভ টু আপিল করে। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন ছয় সদস্যের আপিল বিভাগে ৪ জুলাই সেটা খারিজ হলো। এর ফলে হাইকোর্ট বিভাগের রায় পুরোপুরি বহাল থাকল। আর এই বহাল থাকার ঘোষণার মুহূর্তেই ভূকম্পনটা অনুভূত হলো। দুদকের এক হাজারের বেশি দুর্নীতির মামলা এখন বিচারাধীন। দুদকের লিভ পিটিশন খারিজ হওয়ায় এসব মামলা পাইকারিভাবে অবৈধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ, দুদক তার সব মামলা একটি অনুমোদনপত্র দিয়ে দায়ের করেছে। কিন্তু হাইকোর্ট কার্যত বলেছেন, একটি নয়; অন্তত দুটি লাগবে। 
লিভ মঞ্জুরি একটি প্রাথমিক বিষয়। দুদকের আবেদন মঞ্জুর হলে বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ শুনানির সুযোগ সৃষ্টি হতো। এখন আর শুনানি হবে না। অথচ দরকারি ছিল এই শুনানি। এই মামলায় শুধু ব্যক্তির স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত ছিল না। একজন ড. আলমগীর দোষী কি নির্দোষ, সেটা ছিল গৌণ বিষয়। মুখ্য বিষয় ছিল, কতিপয় আইনি ব্যাখ্যা। দুদক আইনসংক্রান্ত কতিপয় প্রশ্ন। তাও এমন প্রশ্ন, যা নতুন করে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।
আওয়ামী লীগের সাংসদ হাবিবুর রহমান মোল্লার মামলায় আপিল বিভাগ মাইলফলক সিদ্ধান্ত দেন। তারা হাইকোর্টের রায় সমুন্নত রাখেন। আমরা আশাবাদী হই। বাংলার মাটিতে তাহলে দুর্নীতির মামলার বিচার হবে। শাসকশ্রেণী ও তাদের মিত্রজীবীরা কোনো প্রকারের বিচারই চান না। তাই মোল্লায় যা অর্জন হয়, আলমগীরে তার বিসর্জন ঘটে। শুধু বিসর্জন নয়, একটা মহাবিপর্যয়। সে জন্যই ভূমিকম্পের সঙ্গে তুলনা করেছি।
প্রতিটি মামলা আলাদা। আলাদা তার ঘটনাবলি ও তথ্য। কিন্তু কতিপয় সাধারণ বিষয় থাকে আইনসংক্রান্ত। আমরা এখন এ রকম একটি আইনি বিষয়ে আলোচনা করব। 
ইয়াসমিনকে আপনাদের মনে পড়ে? পুলিশি হেফাজতে তাঁকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়েছিল। সারা দেশ আন্দোলনে ফুঁসে উঠেছিল। যথারীতি মামলা হয়েছিল। কিন্তু তার বিচার শুরুই হতে পারছিল না। কারণ হলো, সরকারের অনুমোদন লাগবে। কিন্তু বিএনপি সরকার তা দিচ্ছিল না। তারা পুলিশকে রক্ষা করতে চাইছিল। ইতিমধ্যে বিএনপি বিদায় নেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। নারীনেত্রীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। স্যাংশন বা অনুমোদন দিতে তাঁরা তদবির করেন। তিনি তাঁর দপ্তরে ফেরেন। দেখেন টেবিলে ফাইল। তিনি তাতে ঝটিকা সই করেন। তাঁর সেই নব্বই দিনের মেয়াদেই অভিযুক্তদের দণ্ড ঘোষিত হয়। তো আমরা দেখি, অনুমোদনেই জাদু। সরকার বিচার করে না। কিন্তু তারা না চাইলে বিচার শুরুই হতে পারে না। 
প্রতিটি সরকার, তা আইয়ুব হোক, আর জেনারেল এরশাদ হোক কিংবা নির্বাচিত সরকার হোক, সব শেয়ালের এক রা। তারা কখনো অনুমোদনের ক্ষমতা ব্যুরোকে দিয়েছে। ব্যুরোর আঞ্চলিক দপ্তরকেও দিয়েছে। আবার তা কেড়ে নিয়েছে। সেই যুগেও একটি মামলার জন্য একটি অনুমোদন লাগত। সরকারি লোকলস্কর ছাড়া অন্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়েরে অনুমোদন লাগত না। 
দুদক আইনের বিদ্যমান ৩২ ধারা দেখুন। ২০০৪ সালে তাতে প্রথম লেখা হলো, ‘দুর্নীতির মামলা দায়েরে দুদকের আগাম অনুমোদন লাগবে। অনুমোদনের অনুলিপি মামলা দায়েরের সময় আদালতে দিতে হবে। অনুমোদনের প্রক্রিয়াটা বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে।’ এটা ইতিহাসে প্রথম। প্রথমবারের মতো অনুমোদন প্রদানের এখতিয়ার কমিশন পেল। সরকারের ভূত চলে গেল। কিন্তু সেই ভূতটা ভিন্নরূপে ফিরে এল।
নতুন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো পাবলিক সার্ভেন্ট আর বেসরকারি নাগরিকের ব্যবধান ঘুচে গেল। এখন দুদকের মামলা মানেই অনুমোদন থাকতে হবে। কেন অনুমোদন লাগে? যুক্তি হলো, গণকর্মচারীরা সেবা দেন। দিতে দিতে বেভুল মনে কত কি ভুলচুক করে ফেলতে পারেন। যাতে তাঁরা অহেতুক মামলায় না জড়ান, সে জন্য অনুমোদনের রক্ষাকবচ দেওয়া হয়। ড. আলমগীর সরকারে ছিলেন না। আগের আইন থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হতো। অনুমোদনের প্রশ্ন উঠত না। 
অনুমোদন কোনো মৌলিক অধিকার নয়। সংসদ এ বিধান বিলোপ করতে পারে। মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া কী হবে, তা দুনিয়ার কোথাও মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত নয়। যুদ্ধাপরাধীদের ট্রাইব্যুনালে নিতে ফৌজদারি কার্যবিধিটাই বাতিল করা হয়েছে। কথা হলো, বিচার হতে হবে সুষ্ঠু। সেটা পাওয়া অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার। 
প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে আমরা অনুমোদন-নাচ দেখছি। অভিযুক্তদের অনেকেই রাঘববোয়াল। তাঁরা ইনিয়ে-বিনিয়ে বিচিত্র সব গল্প ফেঁদেছে। এতে অনুমোদন-যন্ত্রটা সরকারের কাছে না থাকার ঘাটতি পূরণ হচ্ছে। দুদক-স্বাধীনতা দাঁড়াল, যাহা বায়ান্ন তাহা তেপ্পান্ন। 
১৮ এপ্রিল ২০০৭ অধ্যাদেশ জারি হলো। অনুমোদনসংক্রান্ত ৩২ ধারা সংশোধন করা হলো। অথচ এর কোনো দরকার ছিল না। সংসদ অধ্যাদেশ পাস করেনি। তাতে অনুমোদনের শর্ত পাল্টায়নি। কারণ ওই সংশোধনে শুধু বাক্য বদলায়। লক্ষ্য একই থাকে। ৩২(১) দফায় বলা হলো, কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো আদালত মামলা আমলে নেবেন না। ৩২(২) দফাটা অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার বিষয়। কারণ, এতে দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তার প্রতি নির্দেশনা দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্ত শেষে প্রতিবেদন দাখিলের আগে কমিশনের অনুমোদন সংগ্রহ করবেন এবং সেটা তিনি তাঁর রিপোর্টের (অভিযোগপত্র) সঙ্গে একত্রে আদালতে দাখিল করবেন।’ 
এবার আসুন আমরা দেখে নিই গত তিন বছরে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে এই অনুমোদনের প্রশ্নটি কীভাবে আন্দোলিত হয়েছে।
২০০৮ সাল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অন্তরীণ। তাঁর বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র মামলা হলো। কোয়াশ করতে রিট হলো। এতে অনুমোদনের প্রশ্নটি এল। সেটা অবশ্য দুদক আইনে নয়। কিন্তু সুর, তাল ও লয়টা একই। সেই অনুমোদন দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বললেন, ‘হাইকোর্ট বিভাগ (অথর জজ বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমান) বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদমর্যাদা দেখে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জনগুরুত্ব বা অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় দেওয়া হয়নি। তাই এই অনুমোদন অবৈধ। অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল (সালাহ উদ্দিন আহমেদ) বলেছেন, অনুমোদন একটি প্রশাসনিক বিষয়। কর্তৃপক্ষের সন্তুষ্টিকে আদালতের সন্তুষ্টি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা যায় না।’ 
আপিল বিভাগ (অথর জজ বিচারপতি মো. আবদুল মতিন) বলেন, ‘আমরা অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য সমর্থন করি। কারণ, সেটাই যৌক্তিক। অনুমোদন দেওয়া ঠিক আছে।’ 
অনুমোদন বিরুদ্ধ যুক্তি প্রধানত দুটি আমরা দেখতে পাই। মামলা দায়েরে দুদকের অনুমোদন ছিল যান্ত্রিক। দুদকের অনুমোদন দেওয়ার কথা একাধিক, দিয়েছে একটি। এ বিষয়ে আমরা প্রথম রায় পাই ২০ নভেম্বর ২০০৮। হাবিবুর রহমান মোল্লা বনাম রাষ্ট্র মামলা। বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। তাঁরা রায় দেন, দুদক আইন ও বিধি একেবারেই স্পষ্ট। অনুমোদনের জন্য ফরম পর্যন্ত নির্দিষ্ট করা আছে। এর বাইরে গিয়ে কারণ দেখানোর সুযোগ নেই।’
এর ১৫ মাস ১৪ দিন পর আপিল বিভাগ ওই অভিমত সমর্থন করেন। ৪ এপ্রিল, ২০১০ প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম, বিচারপতি মো. আবদুল মতিন, বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও বিচারপতি এস কে সিনহার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ হাইকোর্ট বিভাগের ওই সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেন। অনুমোদনে যান্ত্রিকতার যুক্তি আপিল বিভাগ অগ্রাহ্য করেন। সেখানে কিন্তু দুদকের দেওয়া একটি অনুমোদনই টিকে যায়। 
ইকবাল হোসেন মাহমুদ টুকুর আয়কর ফাঁকির মামলাও উল্লেখযোগ্য। এটা জরুরি অবস্থার একেবারে গোড়ার দিকের মামলা। টুকুর মামলার অনুমোদন দিয়েছিল এনবিআর। বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রশীদ ড. কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, মাহমুদুল ইসলাম প্রমুখের বক্তব্য শুনলেন। তারপর হাইকোর্ট বললেন, রাজস্ব বোর্ড গঠনটাই অবৈধ। তাই তাদের দেওয়া অনুমোদনও অবৈধ। আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সর্বসম্মতিক্রমে সেই যুক্তি অগ্রাহ্য করেন। 
আপিল বিভাগ অব্যাহতভাবে এভাবে দুর্নীতির মামলার অনুমোদনের প্রশ্নে স্থির ছিলেন। শেখ হাসিনা, টুকু, সাংসদ মোল্লার মামলায় আমরা দেখি আপিল বিভাগ অনুমোদন বিষয়ে অভিযুক্তদের যুক্তি নাকচ করেছেন। আরও একটি মামলার নজির আছে। যেটি নিরঙ্কুশভাবে অনুমোদন প্রশ্নেই রায়। 
নাজিম উদ্দিন বনাম বাংলাদেশ মামলা। বিচারপতি মো. ইমান আলী ও বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। রায় হয় ৪ ডিসেম্বর, ২০০৮। মোল্লার রায়ের ১৩ দিন পর। এতে অনুমোদনসংক্রান্ত সব আইন ও বিধিবিধানের চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়। হাইকোর্ট বেঞ্চ দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অভিমত দেন, অনুমোদন লাগবে মাত্র একটি। ভিন্ন ধরনের কোনো অনুমোদনের জায়গা নেই। হাইকোর্ট যথার্থই দুদকের ১৫(৪) বিধির বরাত দেন। এতে বলা আছে, ‘অভিযোগনামা দায়েরের ক্ষেত্রেই কেবল কমিশনের পূর্বানুমোদন লাগবে।’ এরপর আদালতের ভিন্ন ব্যাখ্যা কি করে চলে?
শুনেছি, এই যথার্থ রায়টির বিরুদ্ধে অভিযুক্তের আইনজীবী (সাবেক মন্ত্রী মাহবুবুর রহমান) আপিলের উদ্যোগ নেন। কিন্তু চেম্বার জজ স্টে দেননি। পরে আর নিয়মিত আপিল হয়েছে বলেও জানা যায় না। আইনের চোখে এই রায় টিকে আছে। 
এ রকম প্রেক্ষাপটে ড. আলমগীরের মামলার রায় এল। বিচারপতি এস এম দস্তগীর হোসেন ও বিচারপতি মোহাম্মদ রইচ উদ্দিনের সমন্বয় গঠিত বেঞ্চ ২০০৯ সালের ১৩ জুলাই রায় দেন। অনুমোদনের প্রশ্নটি এই রায়ে কীভাবে আলোচিত হয়েছে, সে ব্যাপারে আমরা বড়ই আগ্রহী ছিলাম। কিন্তু হতাশ হয়েছি। আমাদের সুপ্রিম কোর্টের পূর্বাপর একটি রায়েরও সেখানে উল্লেখ নেই। মোল্লা নেই। নাজিমউদ্দিন নেই। বরং উল্লেখ আছে দুটো অপ্রাসঙ্গিক রায়। ১৯৪৫ সালে ফেডারেল কোর্ট ও ১৯৪৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অনুমোদন না থাকার কারণে দণ্ড বাতিল করেছিলেন। বিচারপতি এস এম দস্তগীর হোসেন তাঁর রায়ে ‘ল্যাক অব স্যাংশন’ কথাটি উল্লেখ করেন। কিন্তু সেটা এখানে খাটে না। হাইকোর্ট যা উল্লেখ করেননি তা হলো, ১৯৪৫ সালের মামলায় অনুমোদন ছিল। ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনে অভিযুক্তকে আদালতে চালান করা হয় ২২ মে ১৯৪৫। আর অনুমোদনপত্রের তারিখ ছিল ২৩ মে। সুতরাং অনুমোদনপত্রের ঘাটতি ছিল না। এটা তথ্যগত বিচ্যুতি। শোধরানোর দাবি রাখে। 
ড. আলমগীরের মামলার রায় পড়ে বিস্মিত হতে হয়। এ প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের ভূমিকা কী? দুদুকের বিরুদ্ধে এবং আসামির পক্ষে তিনি এক অভাবনীয় অবস্থান নেন। এমনকি বিতর্কিত ব্যাখ্যা দেন। এর পেছনে কে বা কারা, সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। প্রসিকিউশনের খেয়ে-পরে প্রসিকিউশনের বিরোধিতার এমন নজির বিরল। তাঁর যুক্তিগুলো হাইকোর্টের রায়ে লেখা আছে। অনেক আগেই এই রায়ের বিবরণ পেয়েও কিছু লিখিনি। ভেবেছি, এটা কী করে সম্ভব? তাঁর বয়ান ইতিমধ্যে ছাপার অক্ষরে বেরিয়েছে। কিছুদিন আগেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মামলায় স্বয়ং অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে শুনানি করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল দুদকের একাধিক অনুমোদন লাগার যুক্তি নাকচ করেন। আসামিপক্ষে বলা হয় তিনটি অনুমোদনপত্র লাগবে। আমরা তাই উদগ্রীব ছিলাম, আপিল বিভাগের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের এই ‘স্ববিরোধিতা’ কীভাবে আসে। 
একজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমানের ব্যাখ্যা যদি সঠিক হয়, তাহলে সেগুনবাগিচায় দুদকের দালানটা থাকবে। কিন্তু ওটা হবে গোডাউন। আর কিছু থাকবে না। তারেক রহমান ও মামুনের বিরুদ্ধে ৬ জুলাই যে মামলাটা দুদক করল, সেখানেও যথারীতি একটিই অনুমোদন আছে। তাই এই মামলাটিও টেকার নয়। 
শুধু তারেক কেন, বেগম খালেদা জিয়াসহ সব অভিযুক্তের আইনজীবীরা পড়িমরি ছুটবেন বেঞ্চগুলোতে। তাঁরা বলবেন এই দেখুন, আপিল বিভাগ অনুমোদন দিয়েছেন যে দুদকের মামলায় একটি নয়, একাধিক অনুমোদন লাগবে। তাই বলছি, ড. আলমগীরের রায় পুরোপুরি টেকা মানে দুদকের বিচারাধীন মামলাগুলো ধূলিসাৎ হওয়ার নামান্তর। ইতিমধ্যে তেমন বাস্তব লক্ষণও ফুটে উঠছে। 
অনুমোদন প্রশ্নে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান কী বলেছেন, তা জানা জরুরি। তিনি তত্ত্ব দিয়েছেন, মামলা দায়েরে একটি অনুমোদন লাগবে। মামলা আমলে নিতে আরেকটি লাগবে। এই ব্যাখ্যা আজগুবি। আমরা এটা প্রত্যাখ্যান করি। 
বিচারপতি মো. দস্তগীর এ সম্পর্কে তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এফআইআর দায়েরের ক্ষেত্রেও দুদুকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। ৩২(২) ধারায় যে অনুমোদনের কথা বলেছে তা থেকে ৩২(১) ধারার অনুমোদন ভিন্নতর। ড. আলমগীরের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়েরে যেহেতু অনুমোদন ছিল না, তাই মামলাটির পুরো কার্যক্রম বেআইনি হয়ে পড়েছে। যে দণ্ড তাঁকে দেওয়া হয়েছে, তাও বেআইনি হয়ে পড়েছে।’
হাইকোর্ট বিভাগ তাঁর রায়ে ওই অভিমত উল্লেখ করেন। সমর্থন করেন। বিচারপতি দস্তগীর লিখেছেন, ‘আমরা দুদকের আইনজীবীর কাছে জানতে চাইলাম, দুদুকের অনুমোদন কোথায়। জবাব যা পেলাম তাতে দেখি, সেই অনুমোদন ৩২(২) ধারায় অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য দেওয়া হয়েছে। ৩২(১) ধারার আওতায় দেওয়া হয়নি। আদালত বলেন, এখানে একটা ভিন্ন ধরনের অনুমোদন লাগবে।’
আমাদের কথা হলো, ভিন্ন ধরনের অনুমোদন আমরা আইনে দেখি না। বিধিতে পাই না। তদুপরি যদি একটির পরিবর্তে দুটি লাগেই, তাহলেও লিভ মঞ্জুর সমীচীন। কারণ, আপিল বিভাগ সর্বোচ্চ আদালত। তাঁদের পক্ষে আইনের ব্যাখ্যা শুধু নয়, শূন্যতা বা দ্ব্যর্থকতা থাকলে তাও পূরণ করা সম্ভব। দুদকের মামলা দায়েরই যদি অবৈধ হয়, তাহলে দুদক আর কেন মামলা দায়ের করবে। কেন মামলা চালাবে। তাদের কার্যক্রম আপাতত বন্ধ রাখা উচিত কি না, তা বিবেচনার দাবি রাখে।
আইন শোধরানোর দরকার পড়লে সে কথা বলারও এখতিয়ার আপিল বিভাগ রাখেন। রায়ের সঙ্গে রায়ের একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা আমরা দেখি। আমরা দেখি নখদন্তহীন দুদকের প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাদের অস্তিত্ব-সংকট। একটা নৈরাজ্য। 
দুদক এখন রিভিউ পিটিশন দাখিল করতে পারে। আপিল বিভাগ অন্তত অনুমোদন প্রশ্নে আইনি ব্যাখ্যা চূড়ান্তভাবে ফয়সালা দিতে পারেন। এর তো কোনো বিকল্প দেখি না। না হলে প্রধান বিচারপতিরই সম্ভবত উচিত হবে দুদকের মামলা শোনার বেঞ্চগুলো ভেঙে দেওয়া। ২০০৭ সালের পর দায়ের করা দুদকের মামলা যেখানে যেটি যে অবস্থায় আছে, সেগুলো তো এখন বেআইনি হয়ে পড়েছে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

মঙ্গলবার, ৩ এপ্রিল, ২০১২

মোস্তাফা কামালের সমুদ্র রিপোর্ট এবং বিএনপির বিলাপ


বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মহড়া
বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মহড়া
বাংলাদেশের সমুদ্রজয়কে কাল্পনিক ব্লক হাতছাড়া হওয়া না-হওয়ার সঙ্গে তুলনা করে বিএনপি ও কিছু বিশেষজ্ঞ চায়ের কাপে ঝড় তুলছেন। বিরোধী দলের নেতা সংসদে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানানোর পর বিএনপিরই কিছু নেতার যেন গাত্রদাহ শুরু হয়েছে।
ড. মোশাররফ হোসেন প্রেসক্লাবে মিয়ানমারের কাছে ‘ঠকে আসার’ অভিনব তত্ত্ব হাজির করেন। এর পরই মির্জা ফখরুল ইসলাম, যিনি এর আগে ‘সরকারকে বাদ দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে’ সাধুবাদ জানিয়েছিলেন, তিনি এখন ‘শুভংকরের ফাঁকি’ আবিষ্কার ও ‘বিসর্জনের’ তালিকা প্রকাশের দাবি করেছেন। রায় প্রকাশের মতো হাস্যকর দাবিও তুলছেন। কারণ, ইটলস ওয়েবসাইটে মূল রায়, এমনকি উভয় পক্ষের শুনানি, কে কী দাবি করেছে, তার সবকিছু দেওয়া আছে।
তবে বিশেষজ্ঞ মহলের অযাচিত আক্রমণ দুঃখজনক। অধ্যাপক মনিরুজ্জামান মিঞা রায় না পড়ার কথা স্বীকার করেও ‘মিথ্যাচার’ ও ‘জাতিকে লজ্জা’ দেওয়ার কথা বলতে দ্বিধাহীন। প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক জয়-পরাজয় নিয়ে প্রথম আলোয় গত ৩০ মার্চ যা লিখেছেন, তা অনেক ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিকর, অসত্য এবং উদ্ভট বটে। আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ড. শাহ আলম তাঁর রচনার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে সন্দিগ্ধ। এই লেখকের সঙ্গে আলোচনায় লেখাটি জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন রিয়ার অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ আলম। তাঁর মন্তব্য, ‘ইনামুল সাহেব নদী নিয়ে কাজ করেন। লেখা পড়ে মনে হয়, সাগরের অথৈ জলে পড়ে তিনি খেই হারিয়ে ফেলেছেন।’
২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। ড. মোশাররফ ২০০১ সালে জাতিসংঘে কী দাখিল করেছেন, সেটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অজানা। তিনি ইয়াঙ্গুনে বিজয়োল্লাসের তথ্য দেন। কিন্তু সেখানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এ খবরে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
খালেদা জিয়ার উচিত তাঁর কাছে একটি কৈফিয়ত চাওয়া। বিএনপির নেত্রীর সভাপতিত্বে ৯ ডিসেম্বর ২০০২ অনুষ্ঠিত বৈঠকে মহীসোপানের দাবি ২০০৪ সালের মধ্যে জাতিসংঘে পেশ করার (যা ২০১১ সালে আওয়ামী লীগকে করতে হয়েছে) সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল। নইলে স্থলভাগের দুই-তৃতীয়াংশের সমান সমুদ্রসীমা ‘হাতছাড়া’ হতে পারে—এ কথা সাফ বলে দিয়ে ড. মোশাররফকে আহ্বায়ক করে তিনি ১৫ সদস্যের কমিটি করে দিয়েছিলেন। আজ যদি মির্জা ফখরুলের দাবি অনুযায়ী ‘শুভংকরের ফাঁকি’ ঘটে, তাহলে তার দায় কে নেবে? সাগরে ‘দুই-তৃতীয়াংশ’ জলভাগ হাতছাড়া হওয়ার জন্য তো খালেদা জিয়ার শর্তেই ড. মোশাররফকেই আগে কাঠগড়ায় তুলতে হবে। বিএনপিকে মায়াকান্না করতে হলে মরিচের গুঁড়া সরবরাহের খরচটা তাঁর কাছ থেকেই উসুল করতে হবে।
নৌবাহিনী ও সরকারের অন্য সংস্থা যে দুটি জরিপ ২০১০ সালে ঝঞ্ঝার বেগে করল, সেই জরিপ ২০০৪ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার দায়িত্বও ওই কমিটির কার্যপরিধিতে ছিল। কিন্তু ব্যর্থ ড. মোশাররফ ও তাঁর কমিটি সম্ভবত এরপর কোনো বৈঠকেই বসেনি।
আজকের লেখায় আমি অবশ্য সেই সব বন্ধুদেশকে ধন্যবাদ জানাব, যাঁরা ৩৫ বছর আগে বাংলাদেশের সমুদ্রনীতির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিল।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামাল জিয়া-জমানায় অ্যাডভোকেট (অ্যাটর্নি) জেনারেল ছিলেন। ১৯৮২ সালের যে আইনটির অধীনে আমরা রায় পেলাম, সেটি তৈরির পর্বে বাংলাদেশ তাতে ন্যায়পরায়ণতা নীতি সংযোজনে ব্রতী হয়। কারণ, সমদূরত্ব পদ্ধতিতে বাংলাদেশ সাগরে ‘তালাবদ্ধ’ হয়ে পড়ে। তাই জিয়াউর রহমান সরকার সমুদ্রে তালা খোলার কূটনীতিতে যথার্থই মনোনিবেশ করেছিল।
১৯৭৭ সালের ২৩ মে থেকে ১৫ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক একটি সম্মেলন শেষ হয়েছিল। ব্যারিস্টার মোস্তাফা কামাল এর সঙ্গে গোড়া থেকেই যুক্ত হন। এ বিষয়ে তাঁর একটি রিপোর্ট অন্তত ১২ বছর আগে তাঁর কাছ থেকেই সংগ্রহ করেছিলাম। এতে দেখা যায়, বাংলাদেশ তখনই ন্যায়পরায়ণতার সংশোধনী আনে এবং এর সপক্ষে লবি শুরু করে। ওই সম্মেলনে ২৩ জুন ১৯৭৭ আমাদের প্রস্তাবের ওপর ২৮টি দেশ আলোচনায় অংশ নেয়। প্রথম বক্তা সৌদি আরব বলেছিল, বাংলাদেশের উপকূলের যে অনন্য বৈশিষ্ট্য, সেটা বিশ্বের বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তার প্রস্তাব ন্যায্য ও যুক্তিসংগত। ইরান, বাহরাইন, তুরস্ক, সিরিয়া, বেলজিয়াম, রোমানিয়া, সোমালিয়া, মরক্কো, কাতার, সেনেগাল, আলজেরিয়া, ইয়েমেন, যুগোস্লাভিয়া ও ফিলিপাইন সমর্থন দেয়। 
পাকিস্তান বলেছিল, বাংলাদেশের প্রস্তাব সুষ্ঠু ও ন্যায্য। ৫০টি দেশ তা সমর্থন করেছে, তাই সমুদ্র আইনে এর ঠাঁই পাওয়া উচিত। মিসর বলেছিল, এটা আইনানুগ ও ন্যায্য। গাদ্দাফির লিবিয়া ‘উষ্ণ সমর্থন’ দেয়। আফগানিস্তান বলেছিল, বাংলাদেশের সমস্যা ব্যতিক্রমী। তাদের সংশোধনী প্রস্তাব আইনে অন্তর্ভুক্ত হোক।
১৪তম বক্তা ছিল ভারত। ভারতীয় প্রতিনিধি বলেছিলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামুদ্রিক বৈশিষ্ট্য এবং তাদের প্রস্তাব পরীক্ষা করে দেখব। তবে ভারতের এ মুহূর্তে দুটি আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের শর্তে বেজলাইন স্থির করা হলে তা সমুদ্রসীমা ও ইইজেড নির্ধারণে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু মিয়ানমার নীরব থাকে।
এই সম্মেলনে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো বেশি সরব ছিল। বার্বাডোজ বলেছিল, বাংলাদেশ অবিরাম পাললিক ক্ষয়সাধন সমস্যায় ভুগছে। তাদের প্রস্তাব আইনকে আরও উন্নত করবে। মালটা, বাহামা ও সেনেগাল শুধু সমর্থনই নয়, তারা আমাদের পক্ষে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও তুলে ধরেছিল। ইন্দোনেশীয় প্রতিনিধি হাস্যরস সঞ্চার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘মাননীয় চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের সংশোধনী বিশাল সমর্থন লাভ করেছে। আপনি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিন। তাদের প্রস্তাব ইতিমধ্যে মতৈক্য সৃষ্টি করেছে।’ এর পরই হাসির রোল। আমাদের রাষ্ট্রদূত কে এম কায়সার সম্মেলনে বলেছিলেন, অন্যের স্বার্থ ক্ষতি করে নয়, বাংলাদেশের চাওয়া হলো, তাকে যেন প্রকৃতির কারণে খেসারত দিতে না হয়। ‘তালাবদ্ধ’ হতে না হয়।
সেদিন সম্মেলনকক্ষে কেউ প্রত্যক্ষভাবে আমাদের বিরোধিতা করেনি। কিন্তু আমরা লক্ষ করি, জাতিসংঘের দ্বিতীয় কমিটির ওই অধিবেশনের চেয়ারম্যান ছিলেন ভেনেজুয়েলীয় আইনবিদ ও কূটনীতিক আন্দ্রেজ আগিয়্যার। পরে তিনি আন্তর্জাতিক কোর্ট অব জাস্টিস আইসিজের বিচারক হন। তিনি যেন আমাদের প্রতি নারাজ ছিলেন। রাষ্ট্রদূত কায়সারকে পরে তিনি বলেছিলেন, ‘বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য সমুদ্ররাষ্ট্রও বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি।’ তখন তাঁকে বলা হয়, কেউ কিন্তু বিরোধিতাও করেনি। এ সময় আগিয়্যার বলেন, বৈঠক শেষে ফ্রান্সের প্রতিনিধি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং একান্তভাবে বাংলাদেশের অবস্থানের বিরোধিতা করেন। তাঁর দাবি, ফরাসি প্রতিনিধি তাঁকে বলেছেন, প্রকাশ্যে তাঁরা আপত্তি তোলেননি। কারণ, বাংলাদেশকে তাঁরা বিব্রত করতে চান না। বাংলাদেশ এমন দাবি করেছে, যা মেনে নেওয়া হলে বহু দেশ তাদের অনন্য উপকূলীয় বৈশিষ্ট্যের কথা বলে সমুদ্র গলাধঃকরণের মওকা পাবে।
আগিয়্যার আরও বলেছিলেন, সমর্থক দেশগুলোর ১৬টিই ইসলামি। আর তাদের সমর্থন অনেকটা রাজনৈতিক ধাঁচের। তিনি আমাদের রাষ্ট্রদূতকে এমনও বলেছিলেন, স্পেন যখন প্রস্তাব নিয়ে এল, তখন লাতিন আমেরিকান দেশগুলো সমর্থন দিতে দ্বিধা করল না।
আগিয়্যার বলেছিলেন, ‘ভারতীয় আপত্তি অগ্রাহ্য করা যায় না। সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রিয়া যদিও বলেছে তারা প্রস্তাব সমর্থন করবে, কিন্তু একই সঙ্গে তারা বলেছে যে প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বার্থ সুরক্ষা বিবেচনায় নিতে হবে। সুতরাং, তারা শর্তযুক্ত সমর্থন দিয়েছে। উপরন্তু চীন তার “নীতিগত সমর্থন” বলতে কী বুঝিয়েছে, তা তারা ব্যাখ্যা করেনি। একইভাবে বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো তাদের সমর্থনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট কারণ দেখায়নি।’
মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘মনে হচ্ছে আগিয়্যার বাংলাদেশের জন্য ঝামেলা পাকাতে পণ করেছেন।’ আগিয়্যার অবশ্য দুটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর একটি হচ্ছে, শীর্ষ সমুদ্ররাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাংলাদেশকে বৈঠকে বসা। দ্বিতীয়ত, খসড়া আইনে ভারতীয় আপত্তিসহ বাংলাদেশের সংশোধনী অন্তর্ভুক্ত করা। এর একটিতেও বাংলাদেশ রাজি হয়নি। এরপর যখন খসড়া প্রকাশ পেল, তখন দেখা গেল, সেখানে বাংলাদেশের সংশোধনী অনুপস্থিত। মোস্তাফা কামাল লিখেছিলেন, ‘এটা দেখে আমরা বেদনাহত হয়েছিলাম, কিন্তু বিস্মিত ছিলাম না।’
তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে, ১৯৮২ সালের আইনে ন্যায়পরায়ণতার বিধান টিকে যায় এবং আজ আমরা তার ফল পাই। স্পেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সমদূরত্ব নীতির বিরোধিতা করেছিল। মোস্তাফা কামাল লিখেছেন, ‘আমরা ব্যাপক অনানুষ্ঠানিক আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলাম, যাতে সমদূরত্ব নীতি সমালোচিত হয়েছিল এবং কেবল ন্যায়পরায়ণতার নীতি সবচেয়ে নিরাপদ বিবেচিত হয়েছিল।’ তাই ২০১২ সালে বড় জয়টা হলো ’৭৭ সালের আমাদের উল্লিখিত নীতিগত অবস্থান নাকচ করা হয়নি, সমর্থিত হয়েছে। রায়ের ৩২৫ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘ট্রাইব্যুনাল তাই বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা যেখানে তার অবতলতার জন্য কাটা পড়ছে (আগে উল্লিখিত ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থা) তা এড়াতে সমদূরত্ব নীতি সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিল। আদালত স্থির করলেন, একটি ন্যায়সংগত সমাধান দরকার।’
ইটলস রায় ও মিয়ানমারের সংসদে দেওয়া বিবৃতিতেও আমরা তার স্বীকৃতি পাই। ইটলসে মিয়ানমারের এজেন্ট অ্যাটর্নি জেনারেল ড. তুন শিন গত ২২ মার্চ মিয়ানমারের সংসদে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, ‘আদালত বাংলাদেশের উপকূলের ভৌগোলিক অবতলতা বিবেচনায় নিয়েছেন। তাঁরা মিয়ানমার বা বাংলাদেশের দাবি করা সমুদ্রসীমারেখার কোনোটিই গ্রহণ করেননি।’
তবে লক্ষণীয়, দুই দেশের উপকূলের আয়তনের অনুপাতে জলসীমার বণ্টন সমন্বয়কে উভয়ের জন্য ‘ন্যায্য ও সুবিচারপূর্ণ’ উল্লেখ করেও ড. শিন তথ্য দেন যে বাংলাদেশ বেশি সমুদ্র এলাকা পেয়েছে। তাঁর কথায়, ‘বাংলাদেশ ৬৯ হাজার ৭১৭ বর্গ কিলোমিটার দাবি করেছিল। ইটলসের সিদ্ধান্তের সীমারেখা অনুযায়ী তারা পেয়েছে এক লাখ ১১ হাজার ৬৩১ বর্গ কিলোমিটার, যা ৪১ হাজার ৯১৪ বর্গ কিলোমিটার বেশি।’ (সূত্র: নিউ লাইট অব মিয়ানমার, ২৩ মার্চ, ২০১২)। আমাদের উক্ত দাবি ছিল মূলত পদ্ধতিগত কারণে। বর্মী ভাষায় প্রকাশিত একটি সাপ্তাহিক সাময়িকী ১৬ মার্চ সংখ্যায় আমাদের লাভবান হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। উল্লেখ্য, সমদূরত্বের নীতি টিকে গেলে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটারও ছাড়াত না।
ম. ইনামুল হকের ওই নিবন্ধ বেশ জীবাণু ছড়িয়েছে। তিনি রায়ের ৪৭১ অনুচ্ছেদের ভুল অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেন। ট্রাইব্যুনাল বলেননি যে ‘বাংলাদেশ ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানের (সিএস) যে দাবি করেছে, তা মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইল ইইজেড।’ সেন্ট মার্টিনে ১২ নটিক্যাল মাইল পাওয়ার পরও তাকে পরাজয় বলা তাঁর ধারণাগত ভুল। 
আসলে আমরা আদালতের বদান্যতা কিংবা প্রজ্ঞায় সাগরে ‘তিনবিঘা করিডর’-এর কবলে পড়া থেকে বেঁচে গেছি। বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইল মানে যেখানে শেষ, সেখান থেকে আমাদের আউটার মহীসোপান অর্থাৎ গভীর সমুদ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। কারণ, মিয়ানমারের ২০০ নটিক্যাল মাইলের সমুদ্রসীমা পথ আগলায়। এতে দ্বৈত অবতলগত সংকট সৃষ্টি হয়। সে কারণে গভীর সমুদ্রেও আমরা দ্বিতীয়বার ‘তালাবদ্ধ’ অবস্থায় পড়ি। আদালত তাই একধরনের করিডর সৃষ্টি করেন, নামকরণ করেন ‘ধূসর এলাকা’। এর মাছ খাবে মিয়ানমার, তলদেশের খনিজ তুলবে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারের আপত্তি সত্ত্বেও ২০০ নটিক্যাল মাইলের পরে বাংলাদেশের আউটার মহীসোপানের সূচনা তিরচিহ্ন দিয়ে ইটলস নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। জগৎশীর্ষ সমুদ্র আইনবিশারদ কেমব্র্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেমস ক্রফর্ড (এ মুহূর্তে হেগের আদালতে কাশ্মীরের কিষাণগঙ্গা নদী মামলায় ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের মুখ্য কৌঁসুলি) আমাকে নিশ্চিত করেন যে বাংলাদেশের অনুকূলে আদালতের এ সিদ্ধান্তের কোনো তুলনা নেই। ওই ‘ধূসর এলাকা’ পেরিয়ে আমরা অবাধে আউটার মহীসোপানে যাতায়াত করতে পারব। উল্লেখ্য, চূড়ান্ত আউটার মহীসোপান-সীমা ঠিক করবে জাতিসংঘের কমিশন। মিয়ানমারের অ্যাটর্নি জেনারেল এর সুরাহা ২০৩৬ সালের আগে মিলবে না বলে সংসদকে জানান। তাই মহীসোপানের বিশাল এলাকা বিসর্জনের দাবি উদ্ভট।
আর কাল্পনিক ও আইনত এখতিয়ারবহির্ভূত ‘ব্লক হারানোর’ ঘটনায় পরাজয়ের প্রশ্ন বালখিল্যতা। বিএনপি ভাগ্যিস অ্যান্টার্কটিকায় ব্লক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তাহলে অবশ্য আজ তারা বলতে পারত, আওয়ামী লীগ অ্যান্টার্কটিকা বিসর্জন দিয়েছে! 
বড় কথা হলো, ইটলস আমাদের সেই রায় দিয়েছে, যাতে উল্লিখিত আগিয়্যার কুলের ন্যায়বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি পরাস্ত হয়েছে। 
ভুলত্রুটির সমালোচনা কাম্য, কিন্তু তা যেন আদালত অবমাননার শামিল না হয়। সুপ্রতিষ্ঠিত সমদূরত্ব নীতির বিচ্যুতি বিরল। বিচারক নেলসন, চন্দ্রশেখর ও কট ন্যায়পরায়ণতার নীতি মেনেও তাঁদের খুঁতখুঁতানি চাপা রাখেননি। এক যৌথ ঘোষণায় তাঁরা বলেন, ‘এটা একটা বিষয়কেন্দ্রিক রায় হলো। উপকূলীয় বৈশিষ্ট্য যতই অনন্য হোক, তা বিবেচনায় এক দেশের জন্য ভিন্ন রকম রায় প্রদানের বিপদ কম নয়।’ তাই জয়-পরাজয় মাপতে পানিতে নামার আগে সমুদ্র আইন এবং তার বিচার-আচারের ভেতরকার এসব সূক্ষ্ম বিষয় বুঝতে হবে।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com